হতাশ কলকাতা। হতাশ লক্ষ লক্ষ মেসি-ভক্ত। মাসের পর মাস অপেক্ষা, হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কেনা, শুধুমাত্র একবার চোখের সামনে ফুটবলের রাজপুত্রকে দেখার স্বপ্ন—সবই যেন মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। উত্তেজনায় ভরা দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত রূপ নিল ক্ষোভ, হতাশা ও বিশৃঙ্খলার ছবিতে।
শনিবার গভীর রাতে কলকাতার মাটিতে পা রাখেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি। প্রাইভেট জেটে করে শহরে পৌঁছনোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাত থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়ে যায় উন্মাদনা। মেসির সঙ্গে ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ় এবং আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি’পল। শীতের রাতেও কলকাতা যেন জ্বরে কাঁপছিল—মেসি জ্বরে।

রবিবার সকাল যত এগোতে থাকে, ততই উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। কারণ, ঘোষণা অনুযায়ী এদিন সকালেই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ফুটবলের এই মহাতারকার। হাজার হাজার ভক্ত টিকিট কেটে গ্যালারিতে বসে ছিলেন শুধুমাত্র এক ঝলক দেখার আশায়—যাকে তাঁরা ঈশ্বরের বরপুত্র বলে মানেন।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দর্শকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশ করানো হয়। শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন গায়ক অনীক ধর, এরপর হয় নৃত্য পরিবেশন। তার পরেই মাঠে গড়ায় মোহনবাগান বনাম ডায়মন্ড হারবার লেজেন্ডসদের মধ্যে একটি প্রদর্শনী ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। কিন্তু গ্যালারিভর্তি দর্শকের মন পড়ে ছিল অন্যখানে। মাঠের খেলার দিকে চোখ থাকলেও মন পড়ে ছিল—কখন আসবেন মেসি?
ম্যাচ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই সঞ্চালকের কণ্ঠে ঘোষণা শোনা যায়—“মেসি আসছেন।” মুহূর্তের মধ্যেই গ্যালারির আবহ বদলে যায়। হাজার হাজার মানুষ উঠে দাঁড়ান, মোবাইল ক্যামেরা উঁচু হয়, সকলের চোখ মাঠের প্রবেশপথে। ঠিক সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ সাদা রঙের অডি গাড়িতে করে যুবভারতীতে প্রবেশ করেন লিওনেল মেসি। কালো টি-শার্ট ও ট্রাউজারে, সঙ্গে সুয়ারেজ় ও ডি’পল।
কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় বিভ্রান্তি ও হতাশা। মাঠে নামতেই মেসিকে ঘিরে ধরেন প্রায় ৭০-৮০ জন মানুষ। নিরাপত্তারক্ষী, আয়োজক, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্তারা—সকলের ভিড়ে কার্যত মানুষের দেওয়ালের মধ্যে আটকে পড়েন মেসি। গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার দর্শক, যাঁরা মোটা টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলেন, তাঁরা দূর থেকে কিছুই স্পষ্টভাবে দেখতে পাননি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্ত একাধিকবার মাইক্রোফোনে অনুরোধ করেন দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। কিন্তু বাস্তবে তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। রিপোর্টার ও ক্যামেরাপার্সনদের ভিড়েও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মাত্র ১৬-১৭ মিনিট মাঠে ছিলেন মেসি। সেই সময়ের মধ্যেও গ্যালারির বেশিরভাগ দর্শকের ভাগ্যে জোটেনি প্রিয় তারকাকে এক নজরে দেখার সুযোগ।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান মেসি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শকরা। হাজার হাজার টাকা খরচ করেও স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় রাগ সামলাতে পারেননি অনেকেই। গ্যালারি থেকে মাঠে ছোড়া হতে থাকে পানির বোতল, প্লাস্টিকের জিনিস। ভাঙচুর করা হয় যুবভারতীর বসার সিট, ফ্লেক্স, ব্যানার। মুহূর্তে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ক্রীড়াঙ্গন।
সব মিলিয়ে, ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হওয়ার কথা যে দিন, সেটাই কলকাতার ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে থেকে গেল এক গভীর হতাশার স্মৃতি হয়ে। মেসিকে দেখার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল বহু ভক্তের। প্রশ্ন উঠছে, এত বড় আয়োজনের পরেও কেন সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব? কেন দর্শকদের প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করা গেল না? উত্তর খুঁজছে কলকাতা।



