যুবভারতীতে মেসি বিতর্ক: ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসি কলকাতায় পা রাখবেন—এই খবরে মাসের পর মাস ধরে স্বপ্ন বুনেছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। কেউ ওভারটাইম ডিউটি করে টাকা জমিয়েছেন, কেউ আবার সংসারের প্রয়োজন ছেঁটে টিকিট কেটেছেন। ১০ হাজার, ১৪ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনেও যাঁরা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ঢুকেছিলেন, তাঁদের একটাই আশা—জীবনে একবার চোখের সামনে মেসিকে দেখা। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এমনভাবে ভেঙে চুরমার হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
রবিবার সকালে যুবভারতীতে মেসি ঢোকার মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। মাঠে নামতেই মেসিকে ঘিরে ধরেন অসংখ্য মানুষ—মন্ত্রী, নেতা, আমলা, পরিচিতজন, ক্যামেরাপার্সন। সাধারণ দর্শকরা দূরের গ্যালারিতে বসে কেবল দেখতেই থাকেন, তাঁদের প্রিয় তারকাকে যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়াল করে রাখা হচ্ছে।

🔹 একা মেসির পাশে মন্ত্রী, গ্যালারিতে হতাশ দর্শক
মাঠের ভেতরের ছবি আর গ্যালারির অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল ফারাক। বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে মেসির একাধিক ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় টলিউড অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলীর ছবি। প্রশ্ন উঠতে থাকে—যে দর্শকের টাকায় এই অনুষ্ঠান, সেই দর্শকই কেন বঞ্চিত?
অনেকের অভিযোগ, মেসিকে কার্যত ঘিরে রেখেছিলেন রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের পরিচিতরা। সাধারণ মানুষ দূর থেকে কিছুই দেখতে পাননি। মেসি মাঠে ঢুকেছিলেন ঠিকই, গ্যালারির দিকে হাতও নেড়েছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্ত ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি অধিকাংশ দর্শকের।
🔹 বিশৃঙ্খলার শুরু এবং ক্ষোভের বিস্ফোরণ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে খুব দ্রুত। পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের অনেককেই দেখা যায় সেলফি তুলতে ব্যস্ত। মাঠে একের পর এক মানুষ ঢুকে পড়ায় নিরাপত্তাবলয় ভেঙে যায়। অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে মাত্র ২২ মিনিটের মাথায় মাঠ ছেড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় মেসিকে।
এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শকরা। গ্যালারি থেকে ছোড়া হয় জলের বোতল, ছেঁড়া হয় ব্যানার ও হোর্ডিং। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। যাঁরা সারাটা সকাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিলেন, তাঁদের হতাশা তখন রাগে পরিণত হয়।

🔹 সাধারণ মানুষের প্রশ্ন: প্রতারণা না কি ব্যর্থ আয়োজন?
দর্শকদের একটাই অভিযোগ—তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। কেউ বলছেন, “মেসিকে দেখার জন্য পুজোর খরচ বাঁচিয়েছিলাম।” কেউ আবার বলছেন, “এক মাসের মাইনে দিয়ে টিকিট কেটেও কিছুই পেলাম না।” এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি শাসক দলকে কটাক্ষ করে লেখেন, ভোটের আগে ছবি তোলার রাজনীতি করতে গিয়ে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।
🔹 প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও আইনি পদক্ষেপ
ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমা চান। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার জানিয়েছেন, দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত না দিলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে দর্শকদের টাকা ফেরত দেওয়াই ন্যায্য।
এদিকে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক শতদ্রু দত্তকে। পুলিশের পক্ষ থেকে সুয়োমোটো মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে, দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায় কার—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

🔹 কলকাতার বুকে এক কালো দাগ?
রদ্রিগো দি পল, লুইস সুয়ারেজ়সহ নিজের টিমকে নিয়ে নির্ধারিত সময়েই কলকাতা ছেড়েছেন মেসি। পরবর্তী গন্তব্য হায়দরাবাদ। কিন্তু কলকাতার ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে থেকে যাবে এক গভীর হতাশা। যে শহর নিজেকে ফুটবলের শহর বলে গর্ব করে, সেখানেই কি বিশ্বের সেরা ফুটবলারের সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। তবে এটুকু স্পষ্ট—এই ঘটনা শুধু ব্যর্থ আয়োজন নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গের এক তিক্ত অধ্যায়, যা কলকাতার ক্রীড়া ইতিহাসে দীর্ঘদিন মনে রাখা হবে।



