মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে Iran ও Israel। এই সংঘাতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি যেমন অস্থির হয়ে উঠেছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ Bangladesh-এ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। আর এই সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ Strait of Hormuz। যদি এই সমুদ্রপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তার প্রভাব গোটা বিশ্বে পড়বে—বাংলাদেশ ও ভারতও তার বাইরে থাকবে না।
জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চলে হামলার খবর সামনে এসেছে। বিশেষ করে Saudi Arabia, Qatar এবং Oman-এর কিছু জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার খবর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে চলাচলকারী তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সামনে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় আমদানিকৃত গ্যাস ও তেলের মাধ্যমে। বিশেষ করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির উপর দেশটি অনেকটাই নির্ভরশীল। সূত্রের খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসার কথা থাকা অন্তত দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
যদি এই জাহাজগুলো নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তখন শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে বেশি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে।
ভারতেও পড়তে পারে যুদ্ধের প্রভাব
এই সংঘাতের প্রভাব কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিবেশী দেশ India-তেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতও মধ্যপ্রাচ্যের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল জ্বালানি আমদানির জন্য।
যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভারতের তেল আমদানির খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী অনেক বাণিজ্যিক জাহাজকেই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে—
১. জ্বালানি বাজার:
তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলিতে।
২. বিদ্যুৎ উৎপাদন:
গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে।
৩. কৃষি খাত:
সার তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়তে পারে, ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়বে।
৪. ভোজ্য তেলের বাজার:
মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় ভোজ্য তেলের দামেও প্রভাব পড়তে পারে।
৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য:
মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে রপ্তানি হওয়া পণ্যের পরিবহণ ব্যাহত হলে ভারতের রপ্তানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা
বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এই দেশগুলো জ্বালানি আমদানির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়—বরং এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায়।



