Muhammad Yunus : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উঠে এসেছিল একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি যে ভাষায় জনগণের মন জয় করতে চেয়েছিলেন, তাতে অনেকেই ভেবেছিলেন—দেশে দুর্নীতির অবসান হবে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, বেকারত্ব কমবে। কিন্তু দেড় বছর পেরোতেই সেই আশার জায়গায় এখন প্রশ্ন, ক্ষোভ আর হতাশা।
শেখ হাসিনার আমলের অবসানের পর যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে কি তার কোনও প্রতিফলন ঘটেছে? নাকি ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের অবস্থা আগের থেকেও খারাপের দিকে যাচ্ছে?
🔹 অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু, বড় প্রতিশ্রুতির ঘোষণা
২০২৪ সালের ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চাপে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন শেখ হাসিনা। তিন দিন পর, ৮ অগস্ট ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যেই, ২৫ অগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন ইউনূস।
সেই ভাষণে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন—
✔️ সরকারি প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত করা হবে
✔️ উপদেষ্টা পরিষদের সকল সদস্যের সম্পত্তির হিসাব প্রকাশ্যে আনা হবে
✔️ ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির বিবরণ বাধ্যতামূলক করা হবে
এই ঘোষণার পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল নতুন আশার আবহ।
🔹 প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়ন নেই
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের পথে, অথচ এখনও পর্যন্ত কোনও উপদেষ্টার সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি। বাংলাদেশের প্রথমসারির সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো জানিয়েছে, অধিকাংশ উপদেষ্টা সম্পত্তির হিসাব জমা দিলেও তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
বর্তমানে ইউনূসের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার সংখ্যা ২০ জন। এর পাশাপাশি রয়েছেন বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা—সব মিলিয়ে আরও চার জন। এতজন শীর্ষস্তরের ব্যক্তির সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে।
🔹 নীতিমালা থাকলেও কার্যকর হয়নি
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশ সংক্রান্ত একটি নীতিমালাও জারি করেছিল। সেই নীতিমালায় বলা হয়েছিল—
প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখের ১৫ দিনের মধ্যে আয় ও সম্পত্তির হিসাব প্রধান উপদেষ্টার দফতরে জমা দিতে হবে।
একাধিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হিসাব জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ্যেও স্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও কেন এই তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে আনা হচ্ছে না, তা নিয়েই বাড়ছে বিতর্ক।
🔹 দুর্নীতি কমেনি, বেড়েছে ঋণের বোঝা
শুধু প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নয়, ইউনূস সরকারের আমলে অর্থনৈতিক অবস্থাও প্রশ্নের মুখে। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী—
➡️ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে
➡️ বেকারত্বের হার কমার বদলে ঊর্ধ্বমুখী
➡️ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, শেখ হাসিনার আমলের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশ আরও বেশি ঋণের জালে জর্জরিত। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে, কিন্তু আয়ের সুযোগ বাড়েনি।
🔹 দেড় বছরেই কি গদি ছাড়তে হবে ইউনূসকে?
রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা—মাত্র দেড় বছরেই কি ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছাড়তে হবে? কারণ, যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, তার বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনও শক্ত প্রমাণ মিলছে না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, “প্রক্রিয়া চলছে”—এই একই যুক্তি বারবার সামনে আনা হচ্ছে। সম্প্রতি এক সাংবাদিক বৈঠকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠলে ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, শীঘ্রই সব তথ্য প্রকাশ করা হবে। তবে নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা তিনি জানাননি।
🔹 জনগণের আস্থা কি ফিরবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি উপদেষ্টাদের সম্পত্তির হিসাব প্রকাশ করা না হয়, তবে ইউনূস সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও কমবে। কারণ, ক্ষমতায় এসে মুখে মিষ্টি কথা বললেও বাস্তবে কাজ না হলে জনগণের আস্থা ধরে রাখা অসম্ভব।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস কি শেখ হাসিনার আমলের থেকেও বাংলাদেশের অবস্থা আরও খারাপ করছেন? নাকি শেষ মুহূর্তে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন?



