Sunday, March 1, 2026
Google search engine
Homeরাজ্যপাটরাজ্য রাজনীতিতে ইন্দ্রপতন: মুকুল রায়ের জীবনাবসান, শেষ পর্যন্ত জিতলেন না শেষ লড়াই...

রাজ্য রাজনীতিতে ইন্দ্রপতন: মুকুল রায়ের জীবনাবসান, শেষ পর্যন্ত জিতলেন না শেষ লড়াই !

Mukul Roy Death : একদা যাঁকে বলা হতো বঙ্গ রাজনীতির ‘চাণক্য’, যিনি পর্দার আড়াল থেকে পুরো রাজনৈতিক দাবার ছক সাজাতেন—সেই মানুষটির জীবনাবসান হল নিঃশব্দে। Mukul Roy, যিনি দীর্ঘদিন ছিলেন All India Trinamool Congress-এর সংগঠনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, রবিবার গভীর রাতে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। দীর্ঘ অসুস্থতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং মানসিক ভগ্নতা—সব মিলিয়েই যেন শেষটা হয়ে উঠেছিল অনিবার্য।

তাঁর প্রয়াণে রাজ্য রাজনীতিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রকাশ্যে খুব বেশি না বললেও, রাজনৈতিক মহল জানত—এক সময় যাঁর পরামর্শ ছাড়া তৃণমূলের বড় কোনও সিদ্ধান্তই নেওয়া হতো না, সেই মানুষটি অনেক আগেই রাজনীতির কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।


অন্তরালে থাকা সংগঠক, প্রকাশ্যে না আসা ‘নম্বর টু’

মুকুল রায়ের রাজনৈতিক পরিচয় কখনওই ছিল না জনসভায় হুঙ্কার দেওয়া নেতা হিসেবে। বরং তিনি ছিলেন সংগঠনের কারিগর। অনেকেই তাঁকে ডাকতেন ‘তৃণমূলের অনিল বিশ্বাস’। আবার কারও কাছে তিনি ছিলেন নিঃশব্দ কৌশলী—চাণক্যের মতোই পর্দার আড়াল থেকে চাল দিতেন।

Mamata Banerjee-র সবচেয়ে আস্থাভাজন সহযোগীদের মধ্যে দীর্ঘদিন তাঁর নাম ছিল প্রথম সারিতে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলকে জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সাজিয়ে তুলেছিলেন। বিরোধী শিবির থেকে নেতা ভাঙিয়ে আনার রাজনীতিতে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। নিজে অবশ্য একে বলতেন—“সকলকে নিয়ে চলা”।


রেলমন্ত্রী হওয়া—রাজনৈতিক জীবনের ব্যতিক্রম

রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনওই প্রশাসনিক ক্ষমতার মুখ্য মুখ ছিলেন না। তবে কপালের ফেরে একবার তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জায়গা নিতে হয়েছিল। ইউপিএ সরকারের আমলে রেলমন্ত্রী হন মুকুল রায়। যদিও এই দায়িত্বকে তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বভাবের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি।

রাজনীতি ছাড়াও তাঁর জীবনে আর একটি বড় ভালোবাসা ছিল ক্রিকেট। তিনি ছিলেন ধ্রুপদী টেস্ট ক্রিকেটের অনুরাগী। টি-টোয়েন্টির ধুমধাড়াক্কা তাঁর পছন্দ ছিল না। ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনের মাঝেও সময় বের করে Eden Gardens-এ টেস্ট ম্যাচ দেখতে যেতেন। রেলমন্ত্রী থাকার সময় ভারত টেস্ট ম্যাচ জেতার পর Virat Kohli-কে ফোন করে অভিনন্দন জানানোর ঘটনাও তাঁর ঘনিষ্ঠরা আজও স্মরণ করেন।


ছন্দপতন শুরু ২০১৫ থেকে

তবে রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০১৫ সালের পর। তৃণমূলের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েও ধীরে ধীরে তিনি দলের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সেই সময়ই তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দলের অন্দরমহলে তখন গুঞ্জন—সারদা মামলার চাপ থেকে বাঁচতেই তিনি বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।

এই সময়েই প্রয়াত বিজেপি নেতা Arun Jaitley-র সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা প্রকাশ্যে আসে। মুকুল নিজেও ঘনিষ্ঠ মহলে বলতেন, জেটলিই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে “বাঁচিয়েছিলেন”। এক সময় নতুন দল গঠনের ভাবনাও তাঁর মাথায় এসেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পথ নেননি।

২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে ফের তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হয় তাঁকে। সেই নির্বাচনে বিপুল জয় পায় তৃণমূল। কিন্তু মুকুল–মমতা সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফেরেনি।


বিজেপিতে যাত্রা এবং প্রত্যাবর্তনের ব্যর্থতা

পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন Bharatiya Janata Party-তে। এখানেও তাঁর পুরনো কৌশল—নেতা ভাঙানোর রাজনীতি—চালু করার চেষ্টা হয়। কিন্তু এই পর্বে ফল হয় উল্টো। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপির বড় ধাক্কার অন্যতম কারণ হিসেবেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই কৌশলকে দায়ী করেন।

পরে আবার তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করলেও, তখন তিনি আর ‘মহীরুহ’ নন। অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবহীনতা—সব মিলিয়ে বিধায়ক হিসেবে কার্যত নিষ্ক্রিয়ই থেকে যান।


টেস্ট ম্যাচের মতো দীর্ঘ ইনিংস, কিন্তু শেষটা হলো না রঙিন

মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল টেস্ট ম্যাচের মতো—ধৈর্য, হিসেবি চাল, দীর্ঘ প্রস্তুতি। কিন্তু সময় বদলেছে। রাজনীতিতে এখন টি-টোয়েন্টির যুগ। দ্রুত সিদ্ধান্ত, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট—এই নতুন ছন্দে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি।

অসুস্থতার পর দীর্ঘদিন তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। রবিবার রাত দেড়টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তাঁর পুত্র শুভ্রাংশু রায়।

রাজনীতি থেকে নিঃশব্দে সরে যাওয়া এই মানুষটির প্রয়াণ যেন এক যুগের অবসানের বার্তা বহন করে। যাঁরা সংগঠনের ভিত গড়ে দেন, আলোয় থাকেন না—তাঁদের কথাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments