Murshidabad Migrant : ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক খুনের প্রতিবাদে ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা। ঝাড়খণ্ডে এক বাঙালি শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন গ্রামবাসীরা। জাতীয় সড়ক ও রেললাইন অবরোধ করে চলে তীব্র প্রতিবাদ। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশ কার্যত ব্যর্থ—এমনকি অভিযোগ উঠেছে, উত্তেজনার মুহূর্তে পুলিশ পিছিয়ে যায়, আর তার জেরে মারধরের শিকার হন এক মহিলা সাংবাদিকও। গোটা ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ঘিরে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
কী নিয়ে এই বিক্ষোভ?
মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম আলাউদ্দিন শেখ, বয়স মাত্র ৩০ বছর। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার সুজাপুর কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা। রুজি-রোজগারের সন্ধানে ঝাড়খণ্ডে গিয়ে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে গ্রামে আসে তাঁর মৃত্যুসংবাদ। পুলিশি সূত্রে জানানো হয়, ঝাড়খণ্ডে তাঁর ঘর থেকে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কিন্তু পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়। তাঁদের অভিযোগ, আলাউদ্দিনকে পিটিয়ে খুন করার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যার রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরিবারের বক্তব্য—তিনি বাঙালি ও মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা হওয়াতেই টার্গেট করা হয়েছিল।
“বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি” অভিযোগে ক্ষোভ
এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। অভিযোগ উঠছে, ভিনরাজ্যে বাংলায় কথা বললেই বহু পরিযায়ী শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে। মারধর, অপমান, এমনকি প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাও ঘটছে। দু’টো টাকার জন্য কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকদের অনেক সময় ফিরতে হচ্ছে নিথর দেহ হয়ে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার আদৌ কতটা সচেতন?
বেলডাঙায় রণক্ষেত্র, অবরুদ্ধ জাতীয় সড়ক ও রেল
আলাউদ্দিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুক্রবার সকাল থেকে বেলডাঙায় বিক্ষোভ শুরু হয়। গ্রামবাসীরা জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন, পাশাপাশি বেলডাঙা স্টেশনেও ট্রেন অবরোধ করা হয়। এর ফলে একাধিক লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন আটকে পড়ে। জাতীয় সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়, চরম দুর্ভোগে পড়েন নিত্যযাত্রীরা।
বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ শুধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে নয়—তাঁরা তৃণমূল ও বিজেপি, দুই রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁদের দাবি, ভোটের সময় শ্রমিকদের কথা মনে পড়লেও বিপদের সময়ে কেউ পাশে দাঁড়ায় না।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক
ঘটনাস্থলে বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয় বলে অভিযোগ। আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—উত্তেজিত পরিস্থিতিতে পুলিশ পিছু হটে, আর সেই সুযোগে আক্রান্ত হন এক মহিলা সাংবাদিক। পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি পুলিশই নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়?
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার মাঝেই উত্তরবঙ্গ সফরে যাওয়ার পথে দমদম বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মুখ খুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন,
“বেলডাঙায় জানেন কাদের প্ররোচনা আছে। আমি সব বলতে চাই না।”
পাশাপাশি তিনি বেলডাঙার বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে ‘বৈধ’ বলেও মন্তব্য করেন এবং ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হেনস্তার ঘটনায় বিজেপিকে দায়ী করেন।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন অনেকেই। তাঁদের মতে, শুধু রাজনৈতিক দোষারোপ নয়—প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ।
উপসংহার
ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর লাগাতার হামলা আজ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একের পর এক মৃত্যুর খবর বাংলাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় ঘটে যাওয়া এই বিস্ফোরণ আসলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন একটাই—আর কত মৃত্যু হলে জাগবে প্রশাসন? আর কত নিথর দেহ ফিরলে গুরুত্ব পাবে বাংলার শ্রমিকদের নিরাপত্তা?



