নদিয়ার শান্তিপুরে জমি সংক্রান্ত একটি ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকাজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এক বৃদ্ধার নিজস্ব ভিটে জমি বিক্রির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জোরপূর্বক পোস্টার মারার চেষ্টা করা হয়। সেই পোস্টার ছিঁড়ে ফেলায় রাতের অন্ধকারে বোমাবাজি ও লাগাতার হুমকির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। চরম আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই বৃদ্ধা, শেষ পর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে শান্তিপুর থানার অন্তর্গত তোপখানা পাড়ায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্ত বৃদ্ধার নাম গায়ত্রী পাল। তিনি বর্তমানে একাই নিজের বাড়িতে থাকেন। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং স্বামীও প্রয়াত। নিজের ভিটে বাড়িতেই রয়েছে প্রায় ১৪ কাঠা জমি। পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার কারণে ওই জমির কিছু অংশ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন গায়ত্রী দেবী।
জমি বিক্রির সিদ্ধান্তেই শুরু বিতর্ক
পরিবারের অভিযোগ, জমি বিক্রির উদ্যোগ নিতেই এলাকার একটি সংগঠন— মুক্তি সংঘ রাস কমিটির তরফে চাপ সৃষ্টি করা হয়। দাবি করা হয়, জমি বিক্রির আগে ওই কমিটির সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং এক কাঠা জমি কমিটির জন্য ছেড়ে দিতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, বৃদ্ধার বাড়ির দেওয়ালে একটি পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল— এই জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট রাস কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই পোস্টার কোনওরকম সম্মতি ছাড়াই লাগানো হয়েছিল। পরে পরিবারের তরফে পোস্টারটি খুলে ফেললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

পোস্টার ছিঁড়তেই বোমাবাজির অভিযোগ
অভিযোগ, পোস্টার ছেঁড়ার রাতেই বৃদ্ধার বাড়িকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। শুধু তাই নয়, দফায় দফায় কয়েকজন এসে বৃদ্ধাকে হুমকি দিতে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। যেহেতু গায়ত্রী দেবী বাড়িতে একা থাকেন, তাই আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
চরম মানসিক চাপে ও আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশে অভিযোগ, তদন্ত শুরু
বোমাবাজির ঘটনার খবর পেয়ে সেদিন রাতেই শান্তিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। কে বা কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি চালানো হচ্ছে বলেও সূত্রের খবর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, এমন ঘটনা এলাকায় আগে কখনও ঘটেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একজন বৃদ্ধা একা থাকলে তাঁর নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
রাস কমিটির পাল্টা দাবি
যদিও এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে মুক্তি সংঘ রাস কমিটি। কমিটির এক সদস্য জানান, জমিতে পোস্টার মারার বিষয়টি জোর করে করা হয়নি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, বৃদ্ধার জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলেই পোস্টার লাগানো হয়েছিল এবং সেই সময় সম্মতিও দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, “জোরপূর্বক জমি নেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। উনি তাঁর ব্যক্তিগত জমি বিক্রি করলে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। বরং প্রয়োজনে আমরা সাহায্য করব।” বোমাবাজির ঘটনায় রাস কমিটি বা এলাকার কেউ যুক্ত নয় বলেও দাবি করেন তিনি। পুরো বিষয়টিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ বলে উল্লেখ করে কমিটির একাংশ।

উঠছে একাধিক প্রশ্ন
তবে এই ঘটনার পর একাধিক প্রশ্ন উঠছে। একজন বৃদ্ধা, যিনি একা থাকেন, তাঁর জমি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কেন এমন চাপ তৈরি হবে? পোস্টার মারার বিষয়টি আদৌ কার অনুমতিতে হয়েছে? আর যদি সবটাই ভুল বোঝাবুঝি হয়, তবে বোমাবাজির অভিযোগ এল কোথা থেকে?
এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, প্রশাসনের উচিত দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যটা সামনে আনা। জমি সংক্রান্ত বিবাদ যেন কোনওভাবেই হিংসার রূপ না নেয়, সেই দিকেও নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
বর্তমানে গোটা ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে নদিয়ার শান্তিপুর।



