Nipah Virus Alert : বাংলাজুড়ে ফের এক অজানা আতঙ্কের ছায়া। নিপা ভাইরাস ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে রাজ্য জুড়ে। যদিও এখনও পর্যন্ত গোটা বাংলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি, তবুও একাধিক সন্দেহভাজন ঘটনার খবরে স্বাস্থ্য দফতর কার্যত হাই অ্যালার্ট জারি করেছে। বিশেষ করে ভেন্টিলেশনে থাকা দুই রোগীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় নতুন করে চিন্তা বাড়ছে।
প্রশ্ন উঠছে—২০০১ সালের মতো কি আবার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে বাংলা? নাকি সময় থাকতেই সাবধান হলে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব?
নিপা ভাইরাস: পুরনো স্মৃতিতে নতুন আতঙ্ক
২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাস ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। শিলিগুড়িতে জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, সেই সময় অন্তত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো।
ঠিক সেই কারণেই নিপা ভাইরাস সংক্রান্ত যে কোনও খবর সামনে এলেই প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাসের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি এবং একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে যায়।
বর্তমানে কী পরিস্থিতি?
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে দুই নার্সকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। একজন পুরুষ ও অন্যজন মহিলা—দু’জনেরই অবস্থা গুরুতর।
তাঁদের রক্তের নমুনা পাঠানো হয়েছে আইসিএমআর-এর অধীন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS), কল্যাণী-র ভাইরাস রিসার্চ ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে। পরীক্ষার রিপোর্ট ইতিমধ্যেই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের সদর দফতর স্বাস্থ্য ভবনে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর, রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত সমস্ত কিছু অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কেন এতটা সতর্কতা?
নিপা ভাইরাস এমন একটি সংক্রমণ, যা খুব দ্রুত একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়াতে পারে। একই সঙ্গে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে—
- তীব্র জ্বর
- শ্বাসকষ্ট
- স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব
- এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
এই কারণেই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক থেকে শুরু করে রাজ্য প্রশাসন—সব স্তরেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সচিবও রাজ্যের মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগমের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন বলে জানা গিয়েছে।
কোন খাবার থেকে এখনই দূরে থাকার পরামর্শ?
বিশেষজ্ঞরা আতঙ্ক না ছড়ালেও খাবারদাবার নিয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। নিপা ভাইরাস সাধারণত বাদুড় থেকে ছড়ায়। তাই—
- বাদুড় খেয়েছে এমন ফল (বিশেষ করে খোলা বা আধখাওয়া ফল)
- রাস্তার ধারে খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া ফল বা ফলের রস
- ভালোভাবে ধোয়া হয়নি এমন কাঁচা ফল
এই সব খাবার আপাতত এড়িয়ে চলাই ভালো বলে মত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা আর কী বিষয়ে সতর্ক করছেন?
স্বাস্থ্য দফতরের তরফে এবং চিকিৎসকদের মতে—
- জ্বর, মাথাব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
- অসুস্থ ব্যক্তির খুব কাছাকাছি যাওয়া এড়াতে হবে
- হাসপাতাল ও জনবহুল জায়গায় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত
- অপ্রয়োজনে গুজব বা আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে
বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু এক মুহূর্তের অসতর্কতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
গোটা বঙ্গে ছড়ানোর আশঙ্কা কতটা?
এই মুহূর্তে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রতিটি সন্দেহভাজন ঘটনার উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন এবং মনিটরিং—এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা নিলে নিপা ভাইরাসের মতো সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শেষ কথা
নিপা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও সতর্কতাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি সাধারণ মানুষ, স্বাস্থ্য দফতর ও প্রশাসন একসঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। এখনই সাবধান হোন, গুজবে কান দেবেন না এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলুন—এটাই বিশেষজ্ঞদের একমাত্র পরামর্শ।



