Nipah virus : শীত এলেই শহর ও গ্রামে বাড়ে খেজুরের রস খাওয়ার ধুম। ভোরের কুয়াশায় গাছ থেকে নামানো কাঁচা খেজুরের রস অনেকের কাছেই শীতের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এই জনপ্রিয় স্বাদই এবার হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী বিপদের কারণ। শহরে নিপা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর সামনে আসতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। চিকিৎসকদের একাংশের আশঙ্কা, খেজুরের কাঁচা রস থেকেই ছড়াতে পারে নিপা ভাইরাস।
সূত্রের খবর, বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে দু’জন নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, আক্রান্তরা সম্প্রতি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। সেখান থেকেই সংক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। এই খবরে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে শহরবাসীর।
🦠 নিপা ভাইরাস কী এবং কেন এত ভয়ংকর?
নিপা ভাইরাস একটি অত্যন্ত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এটি মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় (Zoonotic Virus)। বাদুড় এই ভাইরাসের প্রধান বাহক বলে মনে করা হয়। খেজুরের রস সংগ্রহের সময় যদি বাদুড় ওই রসে লালা বা মল-মূত্র ফেলে, তাহলে সেই রসের মাধ্যমে সহজেই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হল—নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখনও নেই। একবার সংক্রমিত হলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যায়। মৃত্যুহারও তুলনামূলকভাবে বেশি।
🍯 খেজুরের গুড় কি নিরাপদ?
এ বিষয়ে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, খেজুরের রস ফুটিয়ে গুড় তৈরি করলে নিপা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না। কারণ উচ্চ তাপে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। তাই খেজুরের গুড় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। বিপদের আশঙ্কা মূলত কাঁচা, অপরিশোধিত খেজুরের রস থেকে।
🤒 নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কী কী উপসর্গ দেখা যায়?
চিকিৎসকদের মতে, নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত তা মারাত্মক আকার নিতে পারে। সাধারণ উপসর্গগুলি হল—
- হঠাৎ জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- গলা ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
গুরুতর ক্ষেত্রে এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে সংক্রমণ) পর্যন্ত হতে পারে।
তবে চিকিৎসকরা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ নিপা ভাইরাস বায়ুবাহিত নয়—হাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায় না। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, কাশি, হাঁচির ড্রপলেট বা শরীরের ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়ায়।
🏥 রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের কড়া গাইডলাইন
নিপা ভাইরাস মোকাবিলায় রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে।
🔹 ২১ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইন
নিপা আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে বাধ্যতামূলকভাবে ২১ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
🔹 নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
এই ২১ দিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাস্থ্যের খোঁজ নেবে স্বাস্থ্য ভবন। প্রতিদিন ফোনে যোগাযোগ করা হবে।
🔹 দিনে দু’বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা
হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে দিনে দু’বার শরীরের তাপমাত্রা ও উপসর্গ পরীক্ষা করতে হবে।
🔹 উপসর্গ দেখা দিলেই ভর্তি
সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখতে হবে।
🔹 স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সুরক্ষা
নিপা আক্রান্ত রোগীর দেখভালে যুক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের PPE কিটসহ সবরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে।
🧪 নিপা টেস্ট ও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার নিয়ম
নিপা ভাইরাস পজিটিভ হলে প্রতি ৫ দিন অন্তর পরীক্ষা করতে হবে।
লালারস, রক্ত ও ইউরিন—এই তিনটি নমুনার রিপোর্ট যদি একই দিনে দু’বার নেগেটিভ আসে, তবেই রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হবে।
ছাড়া পাওয়ার পরও ৯০ দিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে রোগীকে।
🔔 উপসংহার
শীতের প্রিয় খেজুরের রসই যদি ভয়ংকর রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলুন, পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন এবং সামান্য উপসর্গ দেখলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সতর্ক থাকলেই নিপা ভাইরাসকে দূরে রাখা সম্ভব।



