Pakistan Economic Crisis : একদিকে যখন ভারত বিশ্বের একের পর এক শক্তিধর দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করছে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড গড়ছে, ঠিক সেই সময়েই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি করল পাকিস্তান। আর সেই স্বীকারোক্তির ভাষা এতটাই অকপট যে, তা শুনে আন্তর্জাতিক মহলেও তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন—দেশের অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাঁকে এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে বিশ্ব ঘুরে ঘুরে আর্থিক সাহায্য চাইতে হচ্ছে। শুক্রবার রাতে ইসলামাবাদে শীর্ষ রফতানিকারকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানের জন্য এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি গভীর আত্মসম্মানের সংকট।
“বিদেশে টাকা চাইতে গিয়ে মাথা নিচু হয়ে যায়”
শাহবাজ শরিফের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্বীকারোক্তি। তিনি বলেন, “আমি আর আসিম মুনির যখন বিভিন্ন দেশে গিয়ে আর্থিক সাহায্যের আবেদন করি, তখন লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়। ঋণ নেওয়া আত্মসম্মানের উপর বড় আঘাত। অনেক সময় আমরা না বলতে পারি না—যা শর্ত দেওয়া হয়, সেটাও মেনে নিতে হয়।”
এই মন্তব্য পাকিস্তানের ইতিহাসে বিরল। সাধারণত দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এমন স্বীকারোক্তি এড়িয়ে চলে। কিন্তু অর্থনৈতিক তলানিতে পৌঁছে গিয়ে এবার আর বাস্তবতা লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার বেড়েছে, কিন্তু কার টাকায়?
শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার সম্প্রতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন—এই অর্থের বড় অংশই এসেছে বন্ধুদেশগুলির ঋণ ও আর্থিক সহায়তা থেকে। তাঁর কথায়, “যে মানুষ ঋণ নিতে যায়, তার মাথা সব সময় নিচু থাকে।”
এই মন্তব্য কার্যত স্বীকার করে নিল যে পাকিস্তানের অর্থনীতি আজও স্বনির্ভর নয়। ঋণের উপর দাঁড়িয়ে কোনও দেশ দীর্ঘমেয়াদে সম্মান ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে না—এই সত্যটাই যেন এবার প্রকাশ্যে মেনে নিল ইসলামাবাদ।
IMF-এর দরজায় ফের পাকিস্তান
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন পাকিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সঙ্গে নতুন আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। অর্থনীতি সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যেই কর বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস এবং কড়া আর্থিক নীতির পথে হাঁটছে। তবুও সংকট কাটেনি।
শাহবাজ শরিফ নিজেই স্বীকার করেন, বিদেশি ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের জাতীয় মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁর বক্তব্য, “অন্যের সাহায্যের উপর দাঁড়িয়ে কোনও জাতি দীর্ঘদিন আত্মসম্মান ধরে রাখতে পারে না।”
‘সব সময়ের বন্ধু’ চিন, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়
ভাষণে চিনকে তিনি “সব সময়ের বন্ধু” বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতারকেও ধন্যবাদ জানান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী—
- চিন ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার জমা পুনর্নবীকরণ করেছে
- চিন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে (CPEC) মোট বিনিয়োগ ছাড়িয়েছে ৬০ বিলিয়ন ডলার
- সৌদি আরব দিয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও ১.২ বিলিয়ন ডলারের তেল সুবিধা
- সংযুক্ত আরব আমিরশাহি দিয়েছে ২ বিলিয়ন ডলার
- কাতার করেছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও এলএনজি চুক্তি
তবুও প্রশ্ন উঠছে—এত আর্থিক সহায়তার পরেও কেন পাকিস্তানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না?
ভয়াবহ বাস্তবতা: দারিদ্র, বেকারত্ব আর ঋণের পাহাড়
পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। চরম দারিদ্রে রয়েছেন ১৬.৫ শতাংশ নাগরিক। বেকারত্বের হার ৭.১ শতাংশ, অর্থাৎ ৮০ লক্ষেরও বেশি মানুষ কর্মহীন। সরকারি ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়ে গিয়েছে ৭৬ হাজার বিলিয়ন রুপি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থার জন্য শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, সন্ত্রাসে মদত, প্রতিবেশী দেশের প্রতি শত্রুতামূলক মনোভাব এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিও সমানভাবে দায়ী।
শুধু লজ্জা নয়, দরকার আত্মসমালোচনা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে লজ্জার কথা স্বীকার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যদি পাকিস্তান সত্যিই এই সংকট থেকে বেরোতে চায়, তবে জঙ্গি সংগঠনগুলিকে মদত দেওয়া বন্ধ করতে হবে, প্রতিবেশী দেশের ক্ষতি করার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে এবং নিজের দেশের মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নইলে “বিশ্ব ঘুরে ভিক্ষা” করার এই বাস্তবতা শুধু আজ নয়, আগামী দিনেও পাকিস্তানের পিছু ছাড়বে না।



