PM CARES Fund : সংসদে প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। সরকারের কাজকর্মের উপর নজরদারি চালানোর প্রধান হাতিয়ারও বটে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব। কিন্তু এবার সেই সংসদেই একটি বড় সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তহবিল নিয়ে লোকসভায় কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না—এমনই নির্দেশ নাকি দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের তরফে। বিষয়টি সামনে আসতেই রাজনৈতিক ও সংসদীয় মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় গত ৩০ জানুয়ারি লোকসভার সচিবালয়কে চিঠি দিয়ে জানায়, যে তিনটি নির্দিষ্ট তহবিল নিয়ে সংসদে কোনও প্রশ্ন গ্রহণযোগ্য হবে না। এই তহবিলগুলি হল—
১️⃣ পিএম কেয়ার্স ফান্ড
২️⃣ প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল
৩️⃣ জাতীয় সামরিক তহবিল
এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন—কেন এই তিনটি তহবিল সংসদের প্রশ্নের আওতার বাইরে? কিসের ভয় রয়েছে কেন্দ্রের? সরকার কি জবাবদিহি এড়াতে চাইছে?
🔹 কোন নিয়ম দেখিয়ে প্রশ্ন নিষিদ্ধ?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকসভার কার্যবিধির অনুচ্ছেদ ৪১(২)(৮) এবং ৪১(২)(১৭) উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
এই বিধি অনুযায়ী—
🔸 যে বিষয়গুলির সঙ্গে সরাসরি ভারত সরকারের প্রশাসনিক দায় নেই, সেই বিষয়গুলি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলা যায় না।
🔸 এমন কোনও গোষ্ঠী বা তহবিল, যা সরকারিভাবে সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ নয়, সেগুলির বিষয়েও প্রশ্ন গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই তিনটি তহবিল সরকারি কোষাগারের অর্থে গঠিত নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বেচ্ছা অনুদানে পরিচালিত। ফলে এগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন নয় বলেই দাবি করা হয়েছে।
🔹 পিএম কেয়ার্স ফান্ড কেন বিতর্কের কেন্দ্রে?
২০২০ সালের ২৭ মার্চ কোভিড-১৯ অতিমারির সময় পিএম কেয়ার্স ফান্ড গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, মহামারির সময় অসহায় মানুষদের সাহায্য করা। সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে কর্পোরেট সংস্থা—বিভিন্ন স্তর থেকে বিপুল অর্থ জমা পড়ে এই তহবিলে।
পিএম কেয়ার্স ফান্ডের সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এই তহবিলে জমা পড়েছে প্রায় ৬,২৮৩.৭ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল অর্থ কীভাবে খরচ হয়েছে, কীভাবে নিরীক্ষা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কখনও সংসদে আলোচিত হয়নি—এই অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তুলছে বিরোধী শিবির।
বিরোধীদের দাবি,
✔️ এই তহবিলের ট্রাস্টিরা সরকারের শীর্ষস্তরের ব্যক্তি
✔️ প্রধানমন্ত্রীর নামেই তহবিল পরিচালিত
✔️ অথচ সংসদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না
এই অবস্থায় সংসদে প্রশ্ন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন করে সন্দেহ বাড়াচ্ছে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
🔹 সংসদীয় গণতন্ত্রে কী প্রভাব পড়বে?
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব বিরোধীদের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। এই পর্বেই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক ত্রুটি প্রকাশ্যে আসে। ফলে কোনও বিষয়কে প্রশ্নের বাইরে রাখার অর্থ কার্যত সেই বিষয়কে সংসদের নজরদারি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
👉 যদি একটি তহবিল হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন করে
👉 যদি তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নাম যুক্ত থাকে
👉 তাহলে সেটিকে “সরকারের সঙ্গে সম্পর্কহীন” বলা কতটা যুক্তিযুক্ত—তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে
অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত সংসদের অধিকার খর্ব করার নজির তৈরি করতে পারে।
🔹 কেন্দ্র বনাম বিরোধী সংঘাত আরও বাড়বে?
এই সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্র বনাম বিরোধী সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বিশেষ করে পিএম কেয়ার্স ফান্ড নিয়ে প্রশ্ন নিষিদ্ধ হওয়া ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
বিরোধী দলগুলির দাবি,
“সরকার যদি স্বচ্ছ হয়, তাহলে প্রশ্নে ভয় কোথায়?”
অন্যদিকে, কেন্দ্রের যুক্তি—এই তহবিলগুলি সাংবিধানিকভাবে সরকারের সরাসরি অধীন নয়, তাই সংসদে প্রশ্ন ওঠা অনুচিত।
🔹 আগামী দিনে কী হতে পারে?
এই বিতর্ক শুধু সংসদের অন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
✔️ আদালতে মামলা
✔️ বিরোধীদের আন্দোলন
✔️ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হাতিয়ার
সব মিলিয়ে সংসদে তিনটি তহবিল নিয়ে প্রশ্ন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ভারতীয় গণতন্ত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।



