Rahul Dravid Scotland : ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুনলে প্রথমে অবাক হতে হয়, পরে কৌতূহল আরও বাড়ে। ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের নাম— রাহুল দ্রাবিড়ের স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলা। ভারতের হয়ে শতাধিক টেস্ট ও ওয়ানডে খেলা একজন কিংবদন্তি কীভাবে অন্য দেশের জাতীয় দলের জার্সি পরে মাঠে নামলেন, সেই প্রশ্ন আজও অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর মনে ঘোরাফেরা করে।
রাহুল দ্রাবিড়— নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর নির্ভরতার প্রতিচ্ছবি। ‘দ্য ওয়াল’ নামে পরিচিত এই ক্রিকেটার বহু বছর ধরে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপের মেরুদণ্ড ছিলেন। ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেকের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর অবদান তো ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কিন্তু এই সফল ক্যারিয়ারের মাঝেই ২০০৩ সালে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সেই বছরই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠলেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের একটি স্বল্প বিরতি দেওয়া হয়েছিল। বেশিরভাগ ক্রিকেটার যখন বিশ্রামে, তখন দ্রাবিড় আবার খেলার সুযোগ খুঁজছিলেন।
এই সময়েই আসে এক ব্যতিক্রমী প্রস্তাব— স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলার আমন্ত্রণ। শুনতে অবাক লাগলেও, এটি কোনও ক্লাব ক্রিকেট বা প্রদর্শনী ম্যাচ নয়। স্কটল্যান্ডের জাতীয় দলের জার্সি গায়েই মাঠে নামার সুযোগ দেওয়া হয় দ্রাবিড়কে।
তৎকালীন সময়ে স্কটল্যান্ড আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একেবারেই নতুন। ২০০৩ সালে তারা আইসিসি-র পূর্ণ সদস্য হিসেবে ওয়ানডে মর্যাদা পেয়েছে। অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট ছিল দলটিতে। তাই স্কটিশ ক্রিকেট ইউনিয়নের কর্তারা চাইছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি শুধু রান করবেন না, বরং ড্রেসিংরুমে থেকে দলকে গড়ে তুলতে সাহায্য করবেন।
প্রথম পছন্দ হিসেবে তারা চেয়েছিলেন শচীন তেণ্ডুলকরকে। তবে তখন ভারতীয় দলের কোচ জন রাইট স্পষ্ট করে জানান, এই দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ হলেন রাহুল দ্রাবিড়। রাইটের মতে, মাঠে ও মাঠের বাইরে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রাবিড় ছিলেন আদর্শ।
এই প্রস্তাব দ্রাবিড় নিজেও আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করেন। ক্রিকেট শেখানো ও শেখার সুযোগ— এই দুইয়ের সমন্বয় তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি স্কটল্যান্ড দলের সঙ্গে ইংল্যান্ডে যান এবং প্রায় তিন মাস স্কটিশ শিবিরে কাটান।
এই সময়কালে রাহুল দ্রাবিড় স্কটল্যান্ডের হয়ে মোট ১২টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন। পারফরম্যান্সের দিক থেকেও তিনি নিজের ক্লাস প্রমাণ করেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে মোট ৬০০ রান, গড় ছিল অসাধারণ ৬৬.৬৬। এই ইনিংসগুলির মধ্যে ছিল ৩টি শতরান ও ২টি অর্ধশতরান। পরিসংখ্যান বলছে, তিনি ছিলেন সেই সময় স্কটল্যান্ড দলের ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা।
যদিও তাঁর উপস্থিতিতেও স্কটল্যান্ড খুব বেশি ম্যাচ জিততে পারেনি— মোটে একটি ম্যাচে জয় আসে। কিন্তু জয়-পরাজয়ের বাইরে দ্রাবিড়ের অবদান ছিল অনেক গভীর। তরুণ স্কটিশ ক্রিকেটাররা তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন টেকনিক, ম্যাচ ম্যানেজমেন্ট এবং মানসিক দৃঢ়তা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— এই অংশগ্রহণে আইসিসি নিয়ম ভাঙা হয়নি। দ্রাবিড় ভারতের নাগরিকত্ব বজায় রেখেই বিশেষ অনুমতিতে স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন। এটি ছিল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, যেখানে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার দিয়ে নতুন দলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পরবর্তীকালে একাধিক সাক্ষাৎকারে দ্রাবিড় নিজেও স্বীকার করেছেন, স্কটল্যান্ডের সঙ্গে কাটানো সময় তাঁর ক্রিকেট জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। অন্য সংস্কৃতি, অন্য ড্রেসিংরুম, ভিন্ন মানসিকতা— সব মিলিয়ে এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আজও যখন এই গল্প সামনে আসে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়— রাহুল দ্রাবিড় শুধুই ভারতের নয়, তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের এক প্রকৃত শিক্ষক।



