অপরাধ দমনে তৎপরতা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করল সালানপুর থানার অধীনস্থ রূপনারায়ানপুর ফাঁড়ি। সাম্প্রতিক একটি চেন ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত চালিয়ে আন্তঃরাজ্যের এক পেশাদার ছিনতাইবাজকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং পুলিশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা শুরু হয়েছে।
কীভাবে ঘটেছিল ছিনতাই?
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে রূপনারায়ানপুরের ভিডিও অফিস সংলগ্ন ব্যস্ত এলাকায় এক মহিলা দৈনন্দিন কাজে বেরিয়েছিলেন। সেই সময় হঠাৎ করেই তাঁর গলার সোনার চেন ছিনিয়ে নিয়ে চম্পট দেয় এক যুবক। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটি ঘটে যাওয়ায় আশপাশের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভিযুক্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর আতঙ্কিত ওই মহিলা দ্রুত রূপনারায়ানপুর ফাঁড়িতে এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরই পুলিশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং অবিলম্বে তদন্ত শুরু করে।

সিসিটিভি ফুটেজে মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
তদন্তের প্রথম ধাপেই পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী দল ছিনতাইবাজের গতিবিধি ও চেহারার স্পষ্ট ধারণা পায়। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে অভিযুক্ত কীভাবে এলাকায় ঢুকেছিল এবং কোন পথে পালিয়ে গিয়েছিল।
এই প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তই পুলিশের কাছে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে। ফুটেজের সূত্র ধরেই অভিযুক্তকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
গোপন সূত্রে মিলল বড় খবর
এরপর গোপন সূত্র মারফত পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্ত আবার রূপনারায়ানপুর এলাকায় ফিরে আসতে পারে। এই তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ফাঁড়ির পক্ষ থেকে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। সম্ভাব্য এলাকাগুলিতে সাদা পোশাকে পুলিশ ও সিভিক ভলেন্টিয়ারদের মোতায়েন করা হয়।
নান্দনিক হল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান
গতকাল রূপনারায়ানপুরের নান্দনিক হল সংলগ্ন এলাকায় সন্দেহজনকভাবে এক ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। গোপন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী তাঁর চলাফেরা পুলিশের নজরে আসে। দ্রুত অভিযান চালিয়ে রূপনারায়ানপুর ফাঁড়ির আধিকারিক অরুণাভ ভট্টাচার্য এবং সিভিক ভলেন্টিয়ার বিকাশ বাদ্যকরের তৎপরতায় ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজের নাম ভরত গুরুদাস মাল ওয়াসওয়ানি বলে জানায়। তার বাড়ি মহারাষ্ট্রের নাগপুর-আমরাবতী এলাকায়। প্রাথমিক তদন্তেই পুলিশ নিশ্চিত হয়, এই ব্যক্তিই চেন ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।
আন্তঃরাজ্য ছিনতাই চক্রের কৌশল
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃত ভরত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের কাজ চালাত। সে ট্রেনে করে নাগপুর-আমরাবতী থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আসত। এখানে এসে ভাড়ায় বা আগে থেকে রাখা একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই করত।
ছিনতাইয়ের পর সে নির্দিষ্ট একটি সাইকেল স্ট্যান্ডে মোটরসাইকেল রেখে আবার ট্রেন ধরেই নিজের রাজ্যে ফিরে যেত। এই কৌশলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল অভিযুক্ত। পুলিশের ধারণা, এই পদ্ধতিতে সে একাধিক জেলায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে।

আদালতে পেশ, পুলিশি হেফাজতের আবেদন
ধৃত অভিযুক্তকে মঙ্গলবার সকালে আসানসোল আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তার ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানিয়েছে। পুলিশের দাবি, হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে—
- আরও একাধিক চেন ছিনতাইয়ের ঘটনার তথ্য মিলতে পারে
- লুট হওয়া সোনার চেন ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার হতে পারে
- অভিযুক্তের সঙ্গে অন্য কোনও চক্র জড়িত কি না, তা স্পষ্ট হবে
এলাকাবাসীর স্বস্তি ও পুলিশের প্রশংসা
এই গ্রেফতারের খবরে রূপনারায়ানপুর ও আশপাশের এলাকায় স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি চেন ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্ক বেড়েছিল। পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে তাঁরা এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “সিসিটিভি আর পুলিশের তৎপরতার জন্যই আজ এই অপরাধী ধরা পড়েছে। আমরা পুলিশের কাজকে কুর্নিশ জানাই।”
রূপনারায়ানপুর পুলিশের এই সাফল্য আবারও প্রমাণ করল, আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় পুলিশি কাজ একসঙ্গে হলে অপরাধ দমন সম্ভব। এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থা আরও একবার পুলিশের উপর দৃঢ় হল।



