সলমন খান—এই নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বলিউডের এক অপ্রতিরোধ্য সুপারস্টার। কোটি কোটি অনুরাগী, শত শত হিট সিনেমা, বিপুল সম্পত্তি, খ্যাতি আর ক্ষমতা—সব মিলিয়ে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় একেবারে নিখুঁত জীবন। কিন্তু বাস্তবটা কি সত্যিই এতটাই ঝলমলে? নাকি এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা, একরাশ আক্ষেপ আর নিরব একাকিত্ব?
আমরা অনেক সময় ভাবি, কেরিয়ারে সফল হলেই ব্যক্তি জীবনও নিশ্চয়ই সুখে ভরা। কিন্তু সলমন খানের জীবন সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। নিজের মুখেই তিনি স্বীকার করেছেন—গত ২৫ বছরে নাকি তিনি শুধু হারিয়েছেন। এই কথার ওজনটা বোঝা যায় তখনই, যখন কথাটা আসে এমন একজন মানুষের কাছ থেকে, যাঁর কাছে প্রায় সবকিছুই আছে।

খ্যাতির আলো, আর নিত্যদিনের প্রাণভয়
সলমন খানের জীবন শুধু গ্ল্যামার আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মোড়া নয়। বাস্তবে তাঁকে প্রতিদিন তাড়া করে বেড়ায় প্রাণনাশের আশঙ্কা। একাধিকবার গ্যাংস্টারদের তরফে হুমকি পেয়েছেন তিনি। বাড়তি নিরাপত্তা ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। সাধারণ মানুষের মতো ইচ্ছেমতো রাস্তায় হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা নির্ভার জীবনের স্বাদ নেওয়া—এই সাধারণ বিষয়গুলোও তাঁর জীবনে প্রায় বিলাসিতা।
সদ্য শেষ হয়েছে ‘বিগ বস ১৯’-এর সঞ্চালনার কাজ। তার মাঝেই সিনেমার শুটিং, বিদেশে অনুষ্ঠান, নানা ব্যস্ততা—বছরের প্রায় প্রতিটা দিনই ঠাসা সময়সূচি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তিনি কাজের মধ্যেই ডুবে আছেন। কিন্তু সেই ব্যস্ততার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ক্লান্তি।
প্রেম, সম্পর্ক আর অপূর্ণতা
সলমন খানকে বহুবার প্রেমে পড়তে দেখা গেছে। বলিউডে তাঁর একাধিক সম্পর্ক ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু কোনও সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায়নি। বিয়ে করেননি তিনি। অনেকেই মজা করে তাঁকে “বলিউডের চিরকুমার” বলেন, কিন্তু বাস্তবে এই বিষয়টাই হয়তো তাঁর জীবনের অন্যতম বড় শূন্যতা।
ব্যর্থ প্রেম, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক আর বিশ্বাসভঙ্গ—সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে বারবার ধাক্কা খেয়েছেন সলমন। তাই তাঁকে “ব্যর্থ প্রেমিক” বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না।

একাকিত্বের স্বীকারোক্তি
সবচেয়ে চমকে দেওয়া বিষয় হলো, এত বড় তারকা হয়েও সলমন খান নাকি থাকেন এক কামরার ফ্ল্যাটে। নিজেই বলেছেন, গত ২৫ বছরে তিনি কারও সঙ্গে নৈশভোজে যাননি। হয় শুটিং সেটে, নয়তো বাড়িতে, নয়তো কোনও হোটেলের ঘরে—এই সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যেই কেটে গেছে তাঁর জীবন।
এই জীবনযাত্রার কারণেই বহু বন্ধুকে হারিয়েছেন তিনি। এখন হাতে গোনা চার-পাঁচজন বন্ধু ছাড়া আর কেউ নেই। এই স্বীকারোক্তি শুনলে বোঝা যায়, খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে ধীরে ধীরে মানুষের চারপাশটা ফাঁকা হয়ে যায়।
টাকার পাহাড়, তবুও শান্তির অভাব
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সলমন খান প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির মালিক। অর্থ, যশ, খ্যাতি—সবই তাঁর কাছে আছে। তবুও তাঁকে বলতে হচ্ছে, তিনি সুখী নন। এই জায়গাতেই জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটা ধরা পড়ে।
একদিকে এমন মানুষ আছে, যারা দিন আনি দিন খায়, কিন্তু মানসিক চাপ কম। অন্যদিকে এমন একজন সুপারস্টার, যাঁর সবকিছু থাকার পরেও মনে শান্তি নেই। মানুষ সত্যিই অদ্ভুত—কাউকে দু’টো টাকার অভাব কাঁদায়, আবার কাউকে টাকাই জীবনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সলমন খানের জীবন আমাদের কী শেখায়?
আমরা বাইরে থেকে দেখে অনেক কিছুই কল্পনা করে ফেলি। অনেকেই ভাবেন, “আমি যদি সলমন খানের জায়গায় থাকতাম, তাহলে জীবনটা স্বর্গ হয়ে যেত।” কিন্তু বাস্তবটা বোধহয় এত সহজ নয়। সলমন খানের জীবন দেখিয়ে দেয়—সুখ কোনও গাড়ি, বাড়ি বা ব্যাংক ব্যালান্সে বন্দি নয়।
তিনি নিজেও তাঁর অনুরাগীদের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ ভক্তরাই তাঁকে এখনও শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তবুও খ্যাতির সঙ্গে যে নিঃসঙ্গতা আর বিড়ম্বনা আসে, সেই বাস্তবটাই তিনি তুলে ধরেছেন।
হয়তো এই কারণেই বলা হয়—সুখ জিনিসটা বড্ড দুর্লভ। আপনার যা আছে, সেটাকেই যদি ভালোবাসতে শেখেন, তবেই হয়তো শান্তি মিলবে। সলমন খানের জীবন আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয়।



