মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে আলোড়ন সৃষ্টি করা বাবা ও ছেলে খুনের মামলায় আজ, মঙ্গলবার সাজা ঘোষণা করতে চলেছে আদালত। সোমবার এই মামলায় ধৃত ১৩ জন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করেছে জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালত (প্রথম কোর্ট)। আজ বিচারক কী সাজা ঘোষণা করেন, সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা এলাকা।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না তৈরি হয়, সেই কারণে জঙ্গিপুর আদালত চত্বর জুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আদালত সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের বাড়িতেও পুলিশ ও বিএসএফ জওয়ানদের টহলদারি চলছে।
কী ছিল সেই ভয়াবহ ঘটনা
উল্লেখ্য, গত ১২ এপ্রিল দুপুরে সামশেরগঞ্জ থানার অন্তর্গত তিনপাকুড়িয়া পঞ্চায়েতের জাফরাবাদ গ্রামে নির্মমভাবে খুন হন বাবা হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস। ওই সময় সংশোধিত ওয়াকফ আইন বাতিলের দাবিতে সুতি ও সামশেরগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে।
ঘটনার পর গোটা সামশেরগঞ্জ জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এলাকায় ছড়ায় আতঙ্ক, উত্তেজনা ছোঁয় আশপাশের গ্রামগুলিতেও। রাজ্য রাজনীতিতেও এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
তদন্তে SIT গঠন, দ্রুত চার্জশিট
ঘটনার পর প্রথমে সামশেরগঞ্জ থানার পুলিশই তদন্ত শুরু করে। তবে মামলার গুরুত্ব এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করে রাজ্য সরকার বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। SIT তদন্তে নেমে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার প্রায় ৫৫ দিনের মধ্যেই চার্জশিট জমা দেয় সামশেরগঞ্জ থানার পুলিশ। এত দ্রুত তদন্ত শেষ হওয়াকে প্রশাসনিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হয়।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর দোষী সাব্যস্ত
প্রায় আট মাস ধরে জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতে এই মামলার শুনানি চলে। এই সময়কালে একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি ফরেনসিক রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের প্রমাণ এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখা হয়। উভয় পক্ষের আইনজীবীরা বিস্তারিত সওয়াল-জবাব পেশ করেন।
সব দিক বিচার করে সোমবার আদালত রায় ঘোষণা করে। রায়ে ধৃত ১৩ জন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই রায়ের পরেই নিহতদের পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁদের ঘনিষ্ঠরা।
সাজা ঘোষণাকে ঘিরে চরম সতর্কতা
আজ সাজা ঘোষণার দিন হওয়ায় প্রশাসন কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আদালতের আশপাশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকেও প্রয়োজন ছাড়া আদালত এলাকায় না যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নিহতদের বাড়ির আশপাশেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পরিবার যাতে কোনও ধরনের হুমকি বা অশান্তির মুখে না পড়ে, সেই বিষয়েও কড়া নজর রাখছে প্রশাসন।
নিহতদের পরিবারের প্রতিক্রিয়া
হরগোবিন্দ ও চন্দন দাসের পরিবার আদালতের রায়ের পর ন্যায়বিচারের আশা প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে যে যন্ত্রণা তাঁরা সহ্য করেছেন, তার কিছুটা হলেও সুবিচার হয়েছে। তবে তাঁরা চান, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে তৎপর পুলিশ
সামশেরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় যাতে ফের কোনও অশান্তি ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে টহল বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।
এখন সবার নজর বিচারকের রায়ের দিকে
সব মিলিয়ে আজকের সাজা ঘোষণাকে ঘিরে সামশেরগঞ্জ, সুতি ও জঙ্গিপুর মহকুমা জুড়ে টানটান উত্তেজনা রয়েছে। বিচারক কী সাজা ঘোষণা করেন, সেই রায়ই নির্ধারণ করবে এই বহুচর্চিত মামলার পরবর্তী অধ্যায়।



