Sheikh Hasina : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নাটকীয় পালাবদল বহুদিন দেখা যায়নি। একদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ বিপর্যয়, অন্যদিকে প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে থাকা একজন নেতার অভূতপূর্ব প্রত্যাবর্তন। প্রশ্ন এখন একটাই—শেখ হাসিনা-র ভবিষ্যৎ কী? আর সত্যিই কি বাংলাদেশের সিংহাসনে বসতে চলেছেন তারেক রহমান?
বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়, স্পষ্ট জনাদেশ
শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশ হতেই পরিষ্কার হয়ে যায় ছবিটা। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোট হয়। তার মধ্যে ২০০-রও বেশি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পথ কার্যত নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শুধু দলগত জয় নয়, ব্যক্তিগতভাবেও বড় সাফল্য তারেক রহমানের। তিনি যে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, দুটিতেই জয় পেয়েছেন বিপুল ব্যবধানে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—দেশের মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। দীর্ঘ অস্থিরতা, আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পর সাধারণ ভোটাররা একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই রায় দিয়েছেন।
হাসিনা এখন ভারতেই, ফিরতে হবে কি তাঁকে?
২০২৪ সালে সংরক্ষণ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র আকার নিলে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। সেই সময় থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। রাজনৈতিক মহলে একে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ বলেই দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন আদালতে গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ফাঁসির সাজা ঘোষিত হয়েছে। একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি জানালেও নয়াদিল্লি এ বিষয়ে নীরব থেকেছে।
এখন বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—হাসিনাকে কি দেশে ফিরতেই হবে? নাকি ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সমীকরণে এই বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠবে? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এই ইস্যু আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
মোদির ‘কৌশলী’ বার্তা, নজরে আন্তর্জাতিক মহল
এই আবহেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র অভিনন্দন বার্তা। বিশেষ বিষয় হলো—এই বার্তা তিনি দিয়েছেন বাংলায়। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ মোদি লিখেছেন,
“বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দেশের নির্ণায়ক শক্তির পথে এগিয়েছে। এর জন্য তারেক রহমানকে আমার তরফে উষ্ণ অভিনন্দন। আপনার জয়েই স্পষ্ট যে বাংলাদেশবাসী আপনার নেতৃত্বে আস্থা রাখছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নশীলতার পক্ষে ভারত রয়েছে।”
মোদির বার্তায় শুধু অভিনন্দনই নয়, স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বহুবিধ সম্পর্ক রয়েছে এবং পারস্পরিক স্বার্থে সেই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রাখে নয়াদিল্লি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক শুভেচ্ছা নয়—বরং একেবারে হিসেব করা কূটনৈতিক পদক্ষেপ। হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে ভারত।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়?
তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেও বিএনপির সাংগঠনিক ভিত ধরে রেখেছিলেন। দেশে ফেরার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যে জনসমর্থন পেয়েছেন, তা অনেকের কাছেই চমক। রাজনৈতিক মহলের মতে, তাঁর সামনে এখন দু’টি বড় চ্যালেঞ্জ—এক, ভেতরে স্থিতিশীলতা আনা; দুই, আন্তর্জাতিক মহলে আস্থা তৈরি করা।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, জলবণ্টন—এই সব ইস্যুতেই আগামী দিনে তারেক রহমানের সরকারকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
জামাত বিরোধী শিবিরে, স্পষ্ট বার্তা ভোটারদের
এই নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জামাত দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে। তবে বহু ভোটারই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কট্টরপন্থার পথে নয়, বরং মূলধারার রাজনীতিকেই সমর্থন করছেন। তারেক রহমানের জয় সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে।
সামনে কী হতে পারে?
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তারেক রহমানের সামনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রাস্তা প্রায় খোলা। ভারতের অবস্থানও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে—হাসিনাকেন্দ্রিক সম্পর্ক থেকে সরে এসে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত মিলছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—এই পরিবর্তন কি বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে, নাকি নতুন করে শুরু হবে রাজনৈতিক টানাপোড়েন? উত্তর দেবে সময়ই।



