বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর ক্রমাগত হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগে গোটা দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই আবহেই আজ, শুক্রবার বিকেল চারটেয় এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কোনও বিক্ষোভ বা মিছিল নয়, বরং সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পথে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এই বৈঠকে তাঁর সঙ্গে থাকবেন পাঁচজন সাধুসন্ত।
বিক্ষোভ নয়, কূটনৈতিক পথে প্রতিবাদ
প্রথমে বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশে হিন্দু নিধনের প্রতিবাদে দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়া হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে শুভেন্দু অধিকারী সেই কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা করেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলার পথে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে চান।
শুভেন্দু বলেন,
“আমি আগেই জানিয়েছিলাম, যদি আমাকে দেখা করার অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে দ্বিগুণ লোক নিয়ে এসে বিক্ষোভ করব। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার নিজেই আমাকে সাক্ষাতের সময় দিয়েছেন। তাই আমি শান্তিপূর্ণ পথেই এই বিষয়টি তুলে ধরতে চাই।”
দূতাবাসের চিঠি দেখিয়ে ঘোষণা
সাংবাদিকদের সামনে একটি সরকারি চিঠি তুলে ধরে শুভেন্দু অধিকারী জানান, শুক্রবার বিকেল চারটের সময় বাংলাদেশ দূতাবাসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ডেপুটি হাই কমিশনার। সেই কারণেই পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,
“যাঁরা আমার সঙ্গে আসতে চান, তাঁরা আসতে পারেন। কিন্তু দূতাবাসের কাছাকাছি ভিড় বা বিক্ষোভ করবেন না। আমি চাই না এই কর্মসূচি কোনও অশান্তির রূপ নিক।”
এই ঘোষণার পরেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডে উত্তাল দুই বাংলা
এই দূতাবাস সফরের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। পেশায় একটি কারখানার সাধারণ কর্মী ছিলেন দীপু। অভিযোগ, মৌলবাদীদের হাতে প্রথমে তাঁকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এরপর গাছে বেঁধে জীবন্ত দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই বিভীষিকাময় ঘটনায় স্তম্ভিত ভারত ও বাংলাদেশ—দুই বাংলার মানুষই।
এই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে কতটা সক্ষম? দীপু দাসের হত্যার ঘটনায় আদৌ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানতে এবং প্রতিবাদ জানাতেই শুভেন্দু অধিকারীর এই দূতাবাস সফর বলে বিজেপি সূত্রে জানা গেছে।
পাঁচ সাধুসন্ত কেন?
এই সফরে শুভেন্দুর সঙ্গে পাঁচজন সাধুসন্ত থাকছেন—এই বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিজেপির দাবি, এটি কোনও রাজনৈতিক নাটক নয়, বরং ধর্মীয় ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রতীকী প্রয়াস।
শুভেন্দু জানিয়েছেন,
“বাংলাদেশে যাঁরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাঁরা শুধু একটি সম্প্রদায় নন—তাঁরা আমাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশ। সাধুসন্তদের উপস্থিতি সেই বার্তাই বহন করবে।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও উত্তাপ
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ এই উদ্যোগকে ‘রাজনৈতিক প্রচার’ বলে কটাক্ষ করেছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্য—সব স্তরেই বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা দরকার।
বিজেপি নেতাদের মতে,
“যখন সীমান্তের ওপারে হিন্দুদের উপর বর্বরতা চলছে, তখন চুপ করে থাকা যায় না। শুভেন্দু অধিকারীর এই পদক্ষেপ সাহসী এবং প্রয়োজনীয়।”
আজকের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে দেশ
আজ বিকেল চারটেয় বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠক থেকে কী বার্তা বেরিয়ে আসে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেয় এবং দীপু দাস হত্যাকাণ্ড নিয়ে কী পদক্ষেপের কথা জানায়—তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিক্ষোভ নয় বরং শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক পথে প্রতিবাদের এই সিদ্ধান্ত আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।



