Singur News : স্কুলে পড়তে এসেছিল পড়ুয়ারা। বই-খাতা খুলে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আচমকাই নির্দেশ—ক্লাস বন্ধ, পড়ুয়াদের নিয়ে যেতে হবে মুখ্যমন্ত্রীর সভায়!
এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক ছড়াল হুগলি জেলায়। অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত দেখানোর জন্য সিঙ্গুরের সভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। সভা শেষে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিরিয়ানির প্যাকেট। আর এই ছবি ও ভিডিও সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অভিভাবকরা।
প্রশ্ন উঠছে—পড়াশোনার সময়ে কি এভাবেই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যাবে স্কুল পড়ুয়াদের?
কোথায় ঘটেছে ঘটনা?
এই ঘটনা হুগলির নালিকুল এলাকার দেশবন্ধু বাণী মন্দির স্কুলে। অভিযোগ, বুধবার স্কুল চলাকালীন হঠাৎই পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গুরের ইন্দ্রখালি মাঠে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারি প্রকল্প উদ্বোধনের সভা ছিল।
সভাস্থলে সামনের সারিতে বসে থাকতে দেখা যায় একাধিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের প্ল্যাকার্ড। অথচ বহু অভিভাবকের দাবি, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁদের আগে থেকে কিছুই জানায়নি।
অভিভাবকদের ক্ষোভ কেন?
স্কুল ছুটি হওয়ার সময় পেরিয়ে গেলেও সন্তানরা বাড়ি না ফেরায় চিন্তায় পড়েন বহু অভিভাবক। পরে তাঁরা স্কুলে এসে জানতে পারেন, তাঁদের সন্তানদের মুখ্যমন্ত্রীর সভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এক অভিভাবক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন,
“আমরা তো সন্তানকে পড়াশোনা করতে স্কুলে পাঠাই। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সভায় যাওয়ার জন্য নয়। আমাদের না জানিয়ে এভাবে নিয়ে যাওয়া কি ঠিক?”
আর এক অভিভাবকের বক্তব্য,
“কমপক্ষে আমাদের ফোন করে জানানো যেত। স্কুলের তো দায়িত্ব আছে।”
বিরিয়ানির প্যাকেট ঘিরে নতুন বিতর্ক
সভা শেষে ছাত্রছাত্রীদের হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট তুলে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সেই ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—
খাবারের বিনিময়ে কি শিশুদের সভায় হাজিরা পূরণ করা হয়েছে?
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সভায় স্বাভাবিক জমায়েত খুব বেশি ছিল না। কেউ কেউ বলছেন, “পাঁচ হাজার লোকও হয়নি, তাই ভাড়া করে লোক আনা হয়েছে।”
প্রধানশিক্ষকের স্বীকারোক্তি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই ঘটনায় স্কুলের প্রধানশিক্ষক গদাধর বারুই নিজেই স্বীকার করেছেন যে নির্দেশ এসেছিল প্রশাসনের দিক থেকেই।
তিনি বলেন,
“একেবারে শেষ মুহূর্তে দপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নির্দেশ আসে। তখন অভিভাবকদের জানানোর সুযোগ হয়নি। প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই আমাদের এটা করতে হয়েছে।”
এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—প্রশাসনের নির্দেশে কি স্কুলের স্বাভাবিক পড়াশোনা বন্ধ করা যায়?
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ
ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেছেন পুরশুড়ার বিজেপি বিধায়ক বিমান ঘোষ। তাঁর অভিযোগ,
“তৃণমূল নিজেদের সভায় লোক জোগাড় করতে পারছে না বলেই স্কুলের বাচ্চাদের ব্যবহার করছে।”
বিরোধীদের দাবি, এটি শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উপর সরাসরি আঘাত।
আইন ও নীতির প্রশ্ন
শিক্ষাবিদদের মতে, স্কুল চলাকালীন পড়ুয়াদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন তোলে। শিশু অধিকার কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, পড়ুয়াদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এই ঘটনার পর অনেকেই দাবি তুলেছেন—
✔ স্কুলে এমন নির্দেশ কীভাবে এল, তার তদন্ত হোক
✔ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক
✔ ভবিষ্যতে যেন পড়ুয়াদের এভাবে ব্যবহার না করা হয়
সব মিলিয়ে
সিঙ্গুরের সভা ঘিরে এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এটি শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত এক গুরুতর প্রশ্ন। পড়াশোনার সময়ে ছাত্রছাত্রীদের সভায় নিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। প্রশাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছেই।



