Mehtab Hossain : এক সময় দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিয়েছেন। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের হয়ে কলকাতার ডার্বিতে কাঁপিয়েছেন হাজার হাজার দর্শক। জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন একের পর এক আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেই স্বনামধন্য ফুটবলারকেই এবার হাজিরা দিতে হচ্ছে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য। পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) শুনানিতে তলব করা হয়েছে প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার মেহতাব হোসেনকে। এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
দেশের হয়ে লড়াই করা একজন ক্রীড়াবিদকে নাগরিকত্বের কাগজপত্র দেখাতে ডাকা হওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কমিশনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন খোদ ফুটবল তারকাই।
SIR শুনানিতে কেন তলব করা হলো মেহতাব হোসেনকে?
জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে চলমান স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার আওতায় ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কিছু নথিতে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সেই সূত্র ধরেই রবিবার মল্লিকপুরের আবদুস শাকুর হাই স্কুলে শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে মেহতাব হোসেনকে। অভিযোগ, তাঁর মায়ের নাম সংক্রান্ত নথিতে ভুল তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
এই কারণেই তাঁকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তবে বিষয়টি যে এত বড় আকার নেবে, তা হয়তো ক্রীড়াবিদ নিজেও কল্পনা করেননি।
ভারতীয় ফুটবলের পরিচিত মুখ মেহতাব হোসেন
মেহতাব হোসেন মানেই বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক পরিচিত নাম। কলকাতার দুই প্রধান ক্লাব ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের হয়ে দীর্ঘদিন মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি। মাঝমাঠের শক্ত স্তম্ভ হিসেবে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, ভারতের জাতীয় দলের হয়েও ৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন মেহতাব। দেশের জার্সিতে প্রতিনিধিত্ব করার সময় বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে লড়েছেন তিনি। জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করতে মাঠে ঘাম ও রক্ত ঝরানো সেই ফুটবলারকেই আজ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে দাঁড়াতে হচ্ছে লাইনে—এই বাস্তবতা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
“আমরা কি তাহলে কিছুই করিনি?”—ক্ষোভ উগরে দিলেন মেহতাব
SIR শুনানি নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেহতাব হোসেন। তিনি বলেন,
“দেশের জার্সিতে এতগুলো ম্যাচ খেললাম। মাঠে নেমে লড়াই করলাম, দেশের জন্য সবটুকু দিলাম। তারপরেও যদি আজ আমাকে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়, তা হলে প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি তাহলে কিছুই করিনি?”
তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বহু ফুটবলপ্রেমী এবং ক্রীড়াজগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এই ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
খেলার ব্যস্ততার মাঝেই SIR শুনানির ডাক
এই মুহূর্তে মেহতাব হোসেন পুরোপুরি ফুটবল থেকে দূরে নন। বর্তমানে তিনি বেঙ্গল সুপার লিগে সুন্দরবন অটো এফসি দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দল ইতিমধ্যেই সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের প্রস্তুতির মাঝেই SIR শুনানিতে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ আসে তাঁর কাছে।
একজন কোচ হিসেবে দলের দায়িত্ব সামলে প্রশাসনিক শুনানিতে হাজিরা দেওয়া যে মানসিকভাবে কতটা চাপের, তা সহজেই অনুমেয়।
শুধু মেহতাব নন, তালিকায় একাধিক ক্রীড়াবিদের নাম
প্রসঙ্গত, এই প্রথম নয়। এর আগেও মহম্মদ শামি, লক্ষ্মীরতন শুক্লার মতো পরিচিত ক্রীড়াবিদদের SIR শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো মেহতাব হোসেনের নাম। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ক্রীড়াবিদদের কি অযথা হয়রানি করা হচ্ছে?
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া না হয়রানি—উঠছে বড় প্রশ্ন
দেশের জন্য যাঁরা গর্ব এনে দিয়েছেন, যাঁদের নাম আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে, তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। প্রশাসনের তরফে বিষয়টিকে নিয়মিত প্রক্রিয়া বলা হলেও, ক্রীড়াজগতের একাংশ মনে করছে—এতে সম্মানহানি হচ্ছে ক্রীড়াবিদদের।
এই ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনে দিল SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে। দেশের হয়ে মাঠ কাঁপানো ফুটবলারকে নাগরিকত্ব প্রমাণ দিতে হাজিরা দিতে হওয়া নিঃসন্দেহে গোটা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন ফেলছে।



