শীত পড়তেই পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে সুন্দরবন। কুয়াশা মোড়া নদী, ম্যানগ্রোভ অরণ্যের নীরবতা আর প্রকৃতির অদ্ভুত সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে শীতের সুন্দরবন যেন এক আলাদা রূপে ধরা দেয়। আর সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে যদি হঠাৎ দেখা মেলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা যে আজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক তেমনই এক বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হলেন একদল পর্যটক।
১৩ তারিখ ক্যানিং থেকে প্রায় ৩০ জনের একটি পর্যটক দল সুন্দরবন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকালবেলায় কুলতলির কৈখালী ঘাট থেকে নৌকায় চেপে তারা প্রবেশ করেন সুন্দরবনের গভীরে। একদিনের নির্ধারিত ভ্রমণসূচি অনুযায়ী বিভিন্ন নদী-খাঁড়ি ও বনাঞ্চল ঘুরে দেখার পর ফেরার পথেই অপেক্ষা করছিল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।
আচমকা বাঘ দর্শন
নৌকাটি যখন আজমল মারি ১১ নম্বর জঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছায়, ঠিক তখনই পর্যটকদের চোখে পড়ে জঙ্গলের ধারে এক বিশাল আকৃতি। মুহূর্তের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়—এ যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার! নদীর ধার ঘেঁষে থাকা বাঘটিকে দেখে প্রথমে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি নিজেদের চোখকে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা নৌকায়।
নৌকার মধ্যেই বসে পর্যটকরা বাঘটির গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকেন। কেউ মোবাইল ফোন বের করে ছবি ও ভিডিও তুলতে শুরু করেন। সেই বিরল দৃশ্য নিমেষেই মোবাইলবন্দি হয়ে যায়। বাঘটি কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে জঙ্গলের গভীরে চলে যায়।

জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত
পর্যটকদের অনেকেই জানান, সুন্দরবনে বহুবার এলেও এই প্রথম বাঘের দেখা পেলেন। এক পর্যটক বলেন, “সুন্দরবনে এলে সবাই বাঘ দেখার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই সুযোগ পান। আজ যা দেখলাম, সেটা জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।”
আরেক পর্যটক জানান, “ভয় আর আনন্দ—দু’টো অনুভূতিই একসঙ্গে কাজ করছিল। নিরাপদ দূরত্বে থেকে বাঘটিকে দেখতে পাওয়াটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
বন দফতরের নিয়ম মেনেই বাঘ দর্শন
নৌকার চালক ও বোট মালিক জানান, বন দফতরের সমস্ত নিয়ম মেনেই পর্যটন করা হচ্ছিল। বাঘ দেখা গেলেও নৌকা থামানো হয়নি, কিংবা খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই বাঘ দর্শন করা হয়।
বোট মালিক বলেন, “আমরা কুলতলির কৈখালী ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে বনি ক্যাম্প এলাকার দিকে গিয়েছিলাম। সোমবার ফেরার পথে মৈপিঠের বনবিবির থান এলাকার কাছে এই বাঘটিকে দেখা যায়। বাঘটি তখন নদী সাঁতরে উঠে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল।”
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের প্রমাণ
এই ঘটনাকে সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের একটি বড় প্রমাণ বলেই মনে করছেন অনেকেই। বন বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের শুরুতে বাঘরা প্রায়ই নদীর ধারে দেখা যায়। খাবারের সন্ধান কিংবা এলাকা পরিদর্শনের সময় তারা নদী পারাপার করে থাকে।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। এখানে বাঘের উপস্থিতি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই এটি বন সংরক্ষণের গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে আসে।

পর্যটনের আকর্ষণ আরও বাড়ল
এই বাঘ দর্শনের ঘটনায় সুন্দরবনের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। শীতের মরসুমে এমনিতেই সুন্দরবনে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। তার উপর এই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা ছড়িয়ে পড়লে আগামী দিনে আরও বেশি মানুষ সুন্দরবনমুখী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বন দফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের তরফে বারবার সতর্ক করা হয়েছে, বন্যপ্রাণী দেখার সময় উত্তেজিত হয়ে নিয়ম ভাঙা চলবে না। নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সুন্দরবন শুধু পর্যটনের জায়গা নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। শীতের শুরুতেই বাঘের দেখা পাওয়া যেমন পর্যটকদের জন্য আনন্দের, তেমনই প্রকৃতির শক্তিশালী উপস্থিতির কথাও মনে করিয়ে দেয়।



