Street Dog Case : পথকুকুরের কামড় নিয়ে দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের আবহে এবার কড়া বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্য সরকারগুলির নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বহীনতার উপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল—আগামী দিনে কোনও পথকুকুর কামড়ের ঘটনায় কেউ আহত হলে বা শিশু ও প্রবীণের মৃত্যু ঘটলে তার সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকেই। শুধু তাই নয়, এই ধরনের ঘটনায় রাজ্যকে মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতেও হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার পথকুকুর সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত কড়া। বিচারপতিদের স্পষ্ট মন্তব্য, “রাজ্য সরকারগুলো কার্যত কিছুই করছে না।” আদালতের মতে, দেশে যেভাবে পথকুকুরের কামড়ের ঘটনা বাড়ছে, তা শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে। অথচ এই গুরুতর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বহু রাজ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
কুকুরের কামড় মানেই রাজ্যের দায়?
শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, আগামী দিনে কুকুরের কামড়ে যদি কোনও ব্যক্তি গুরুতর আহত হন বা কোনও শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে সেই ঘটনার দায় আর শুধু স্থানীয় প্রশাসনের ঘাড়ে ঠেলে দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আদালতের মতে, পথকুকুর নিয়ন্ত্রণ ও জনসুরক্ষার দায়িত্ব রাজ্যের, আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার ফল ভোগ করতেই হবে।
শুধু রাজ্য সরকার নয়, কুকুরপ্রেমীদের ভূমিকাও এদিন প্রশ্নের মুখে পড়ে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রাস্তায় কুকুর খাওয়ানোর নামে যদি কেউ দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন, তবে কোনও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাঁরাও দায় এড়াতে পারবেন না।
মামলার প্রেক্ষাপট কী?
উল্লেখযোগ্যভাবে, দেশে পথকুকুরের কামড়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই মামলা গ্রহণ করে। গত বছর ৭ নভেম্বর শীর্ষ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশে বলা হয়েছিল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, আদালত চত্বর, বাসস্ট্যান্ড, রেল স্টেশন এবং স্পোর্টস কমপ্লেক্সের মতো জনবহুল এলাকা থেকে পথকুকুরদের সরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছিল, যেখান থেকে কুকুর সরানো হবে, সেখানে যেন তাদের আবার ফিরিয়ে না আনা হয়।
তবে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সেই নির্দেশের ব্যাখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, রাস্তার প্রতিটি বেওয়ারিশ কুকুরকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র সংবেদনশীল ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকার আশপাশ থেকে পথকুকুরদের সরানোর কথাই বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশও বহু রাজ্যে কার্যকর হয়নি বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ।
কুকুরপ্রেমীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা
এদিনের শুনানিতে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী মন্তব্য করেন, “এই বিষয়টা আবেগের সঙ্গে জড়িত। অনেক মানুষের কাছেই কুকুর ভালোবাসার জায়গা।” এই মন্তব্য শুনে বিচারপতি বিক্রম নাথ স্পষ্টভাবে বলেন, “পথকুকুর কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।” তাঁর বক্তব্য, কুকুরকে খাওয়ানোর কথা যাঁরা বলছেন, তাঁদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
বিচারপতি নাথ কুকুরপ্রেমীদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা যদি এতই কুকুর ভালোবাসেন, তাহলে তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। কুকুর কেন রাস্তায় নোংরা করবে? কেন মানুষকে ভয় দেখাবে? কেন কামড়াবে?” আদালতের এই মন্তব্যে স্পষ্ট, আবেগের নামে জননিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা আর বরদাস্ত করা হবে না।
এই প্রসঙ্গেই আদালত প্রশ্ন তোলে—“আবেগ কি শুধুই কুকুরদের জন্য? মানুষের জীবনের মূল্য কি কম?” পাল্টা জবাবে আইনজীবী গুরুস্বামী বলেন, কুকুরপ্রেমীরা মানুষ নিয়েও সচেতন, তবে আদালত জানিয়ে দেয়, সচেতনতা থাকলেই দায়িত্ব এড়ানো যায় না।
রাজ্যগুলির জন্য কী বার্তা?
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ রাজ্য সরকারগুলির জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। পথকুকুর নিয়ন্ত্রণ, নির্বীজকরণ, টিকাকরণ এবং জনবহুল এলাকা থেকে সরানোর মতো কর্মসূচি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে।
আদালতের মতে, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন, স্থানীয় পুরসভা এবং পশু কল্যাণ সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। নইলে পথকুকুর সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, পথকুকুর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্য সরকার হোক বা কুকুরপ্রেমী—দায়িত্ব এড়ানোর কোনও সুযোগ আর নেই। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাই যে সর্বাগ্রে, সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল শীর্ষ আদালত।



