বুধবার ভোরে মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকা। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিনের মতো শরীরচর্চা করতে বেরিয়েছিলেন দুই যুবক। কিন্তু সেই প্রস্তুতির পথেই থমকে গেল এক তরুণের জীবন। জাতীয় সড়কের ধারে দৌড়ানোর সময় দ্রুতগতির লরির ধাক্কায় মৃত্যু হল ২২ বছর বয়সী রাহুল সিংহের। গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর সঙ্গী সুমন দাস।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি থানার অন্তর্গত মুরালিপুকুর এলাকায়। বুধবার সকাল হতেই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। মুহূর্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
ভোরের দৌড়েই কাল হয়ে দাঁড়াল
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার ভোরের দিকে রাহুল সিংহ এবং তাঁর বন্ধু সুমন দাস সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জাতীয় সড়কের পাশে দৌড়াচ্ছিলেন। প্রতিদিনের মতোই তাঁরা খুব ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, যখন রাস্তায় যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম থাকে।
কিন্তু সেই সময়ই পেছন দিক থেকে একটি দ্রুতগতির লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁদের ধাক্কা মারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ধাক্কার তীব্রতায় রাহুল সিংহ কয়েক ফুট দূরে ছিটকে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই গুরুতরভাবে আহত হন।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো গেল না
দুর্ঘটনার শব্দ শুনে আশপাশের মানুষজন ছুটে আসেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহত দুই যুবককে দ্রুত উদ্ধার করে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা রাহুল সিংহকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় গুরুতর আহত হন তাঁর সঙ্গী সুমন দাস। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাঁকে বহরমপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন বলে জানা গিয়েছে।
পরিবারের স্বপ্নে নেমে এল অন্ধকার
রাহুল সিংহের অকালমৃত্যুতে তাঁর পরিবার কার্যত ভেঙে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন রাহুল। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত দৌড়, শরীরচর্চা এবং ফিটনেস ট্রেনিং ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিন।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, “ছেলেটা দেশের সেবা করতে চেয়েছিল। আর আজ সকালে দৌড়াতে গিয়ে এমনভাবে চলে যাবে, আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।”
এলাকায় শোক ও ক্ষোভ
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুরালিপুকুর এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। অনেকেই জাতীয় সড়কে নিরাপত্তার অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই এলাকায় প্রায়ই দ্রুতগতির ভারী যান চলাচল করে। ভোরের দিকে দৌড়ানো বা হাঁটার সময় পথচারীদের জন্য কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, জাতীয় সড়কের ধারে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, স্পিড ব্রেকার কিংবা আলাদা সার্ভিস রোডের ব্যবস্থা করা হলে এমন দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
পুলিশের তদন্ত শুরু
ঘটনার খবর পেয়ে সুতি থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল, লরিটি কোন দিক থেকে আসছিল এবং চালকের গাফিলতি ছিল কি না—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘাতক লরির সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ফের প্রশ্নের মুখে সড়ক নিরাপত্তা
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফের একবার জাতীয় সড়কে পথচারী ও শরীরচর্চাকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। বিশেষ করে যেসব যুবক সেনাবাহিনী, পুলিশ বা আধাসামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নে ভোরবেলা রাস্তায় দৌড়ান, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা আবারও সামনে এল।
এক তরুণের প্রাণ গেল, অন্যজন লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। রাহুল সিংহের অসমাপ্ত স্বপ্ন আজ গোটা এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।



