বীরভূম জেলার অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত তারাপীঠ মন্দিরে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে ক্রমশ বাড়ছে অসন্তোষ। অভিযোগ, বৈধ প্রেস আইডি কার্ড, চ্যানেলের লোগো সংবলিত বুম কিংবা ক্যামেরা সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মন্দির চত্বর এমনকি গর্ভগৃহ এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ছেন সাংবাদিকরা।
স্থানীয় সংবাদকর্মী হোক বা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিক—সবার ক্ষেত্রেই একই নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। মন্দিরে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উৎসব বা অঘটনের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে এসে সাংবাদিকদের সাধারণ পুণ্যার্থীদের মতো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে করে সময়োপযোগী খবর সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
পরিচয়পত্র দেখিয়েও প্রবেশের অনুমতি মিলছে না
সাংবাদিকদের একাংশের অভিযোগ, মন্দিরের প্রধান গেট ও অভ্যন্তরীণ প্রবেশপথে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা পরিচয়পত্র যাচাই করলেও ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সেবায়েতের ব্যক্তিগত অনুমতি বা ফোন না থাকলে প্রবেশ করা যাবে না।
এই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারী বলে দাবি করছেন সংবাদকর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, জরুরি কোনও ঘটনার সময় সেবায়েতের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হলে কার্যত সংবাদ সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর এটি সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন অনেকে।
দুর্ব্যবহারের অভিযোগও সামনে
শুধু প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন নয়, কোথাও কোথাও নিরাপত্তারক্ষীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিকরা। কয়েকজন সংবাদকর্মীর অভিযোগ, প্রশ্ন করলে বা যুক্তি দেখাতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার ও অশোভন আচরণের শিকার হতে হয়েছে। এতে মন্দির চত্বরে কাজ করার পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
একজন প্রবীণ সাংবাদিকের কথায়,
“আমরা কোনও বিশেষ সুবিধা চাই না। শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাই। কিন্তু এখানে সাংবাদিক পরিচয়টাই যেন অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”

হোটেল ও আবাসনেও কোনও ছাড় নেই
মন্দির চত্বরের পাশাপাশি তারাপীঠের হোটেল ও লজগুলিতেও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে এসে সাধারণ পর্যটকদের মতোই সমপরিমাণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের। ভিড়ের মরসুমে হোটেল ভাড়া চড়া হওয়ায় অনেক সময় সাংবাদিকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
এছাড়াও মা তারার দর্শনের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের জন্য কোনও ‘কুইক অ্যাক্সেস’ বা বিশেষ লাইনের ব্যবস্থা নেই। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যার জেরে সংবাদ কাভারেজে মারাত্মক দেরি হচ্ছে।
সংবাদ সংগ্রহে বিঘ্ন, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন
সাংবাদিকদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা রক্ষা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের কাজ করার ন্যূনতম সুবিধা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই মত সাংবাদিক মহলের।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই নিয়ে একাধিকবার মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত মন্দির কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও স্পষ্ট নীতি বা নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।
সমাধানের দাবি
সাংবাদিকদের একাংশের প্রস্তাব,
- বৈধ প্রেস আইডি থাকলে নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি
- মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে একজন মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ
- জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রবেশের জন্য আলাদা প্রটোকল
এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তারাপীঠ মন্দির শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। সেই কারণে এখানকার ঘটনাবলি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো জরুরি। কিন্তু বর্তমান কড়াকড়ির জেরে সেই কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি সাংবাদিকদের।
এখন দেখার, মন্দির কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের স্বার্থে কোনও বাস্তবসম্মত সমাধান সূত্র বেরোয় কি না।



