Tarique Rahman : রাজনীতিতে বলা হয়—কামব্যাক সবসময় অসম্ভব নয়, কিন্তু সব কামব্যাক ইতিহাস তৈরি করে না। বাংলাদেশে আজ যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকেই বলছেন—এটা শুধুই প্রত্যাবর্তন নয়, এটা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ও আরেক অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় ১৭ বছর যে মানুষটি দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেননি, সেই মানুষটিই আজ বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি তারেক রহমান।
২০০৮ সাল। সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হন তারেক রহমান। জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে দেশ ছাড়েন। সেই যে লন্ডনে পাড়ি, তারপর কেটে যায় দীর্ঘ ১৭ বছর। বাংলাদেশে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন বেড়েছে, কিন্তু তারেক আর দেশে ফেরেননি। ফলে অনেকের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন রহস্যময় চরিত্র—রাজনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় “ডার্ক প্রিন্স”।
কেন ‘ডার্ক প্রিন্স’?
এই উপাধির পিছনেও রয়েছে ইতিহাস। ২০০১ থেকে ২০০৬—এই সময়কালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও অভিযোগ ছিল, পর্দার আড়াল থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন তারেক রহমান। তাঁর মা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সামনে থাকলেও, বাস্তবে দলের রাশ নাকি ছিল ছেলের হাতেই। এই কারণেই রাজনৈতিক মহলে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘ডার্ক প্রিন্স’।
দীর্ঘ নির্বাসন, তবু রাজনীতি থেকে দূরে নয়
লন্ডনে থেকেও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তারেক। দলীয় নির্দেশ, আন্দোলনের রূপরেখা—সবই চলত দূর থেকেই। তবে প্রশ্ন ছিল একটাই—তিনি আদৌ আর দেশে ফিরবেন কি না? বিশেষ করে টানা ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা-র আমলে সেই সম্ভাবনা কার্যত শূন্য বলেই মনে করা হচ্ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বুঝি তারেকের ফেরার পথ খুলবে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস-এর সময়েও নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছিল না।
অবশেষে ফেরা
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরলেন তারেক রহমান। বিমান থেকে নেমে দেশের মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম—এই ছবি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই মুহূর্তেই তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন—এই দেশ তাঁর, এবং তিনি আর কোথাও যাচ্ছেন না।
তারেক দেশে ফিরতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দীর্ঘদিন নেতৃত্বের অভাবে যে দল দিশাহারা হয়ে পড়েছিল, তারা হঠাৎ করেই দিশা খুঁজে পায়।
মানুষের আস্থা কি সত্যিই ফিরেছে?
এর উত্তর মিলেছে ব্যালট বাক্সে। ঢাকা–১৭ এবং বগুড়া–৬—দুই গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকেই জয়ী হন তারেক রহমান। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জয় শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটা বিএনপির উপর জনগণের আস্থার পুনরুদ্ধার। বিশেষ করে যখন কট্টরপন্থী শক্তির উত্থান নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—তারা চায় পরিচিত রাজনৈতিক ধারাকেই।
খালেদা জিয়া নেই, দায়িত্ব পুরোপুরি ছেলের কাঁধে
২০২৫ সালের শেষদিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। রাজনীতি থেকে কার্যত সরে দাঁড়ান তিনি। অনেকেই বলছেন, হয়তো ওপার থেকে ছেলের এই জয় দেখছেন মা। আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাও একটাই—এখন বিএনপির সম্পূর্ণ দায়িত্ব তারেক রহমানের কাঁধেই।
হাসিনাবিহীন বাংলাদেশ, নিয়তির খেল?
রাজনৈতিক মহলে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরছে—এ কি নিয়তির খেল? একসময় শেখ হাসিনার আমলে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল তারেককে। আজ হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে তিনিই ক্ষমতার দোরগোড়ায়। অন্যদিকে, ভারতের মাটি থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন শেখ হাসিনা—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।
সামনে কী?
সব ইঙ্গিত বলছে, খুব শিগগিরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে চলেছেন তারেক রহমান। ‘ডার্ক প্রিন্স’ থেকে দেশের শাসক—এই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। গ্রেফতার, নির্বাসন, বিতর্ক—সবকিছু পেরিয়ে তিনি আবার ফিরে এসেছেন।
রাজনীতিতে সব কামব্যাক সফল হয় না। কিন্তু তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। এখন দেখার, তিনি কি শুধু ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি সত্যিই বদলে দেবেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।



