Tarique Rahman Return India Bangladesh Politics Plan : প্রায় সতেরো বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নাম বারবার আলোচনায় থেকেছে—কখনও পোস্টারে, কখনও মিছিলে, আবার কখনও কেবল গুঞ্জনে। কিন্তু সেই নামের মানুষটি ছিলেন দেশের বাইরে, কার্যত নীরব। অবশেষে সেই দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র, যাঁকে একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডার্ক প্রিন্স’ বলেও অভিহিত করা হতো, তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে ঢাকায় পা রাখলেন এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং একই সঙ্গে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করছে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন
বর্তমানে বাংলাদেশ কার্যত অশান্তির আগুনে জ্বলছে। একাধিক জেলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং প্রাণহানির ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই উত্তপ্ত আবহেই ১৭ বছর পর দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরপরই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এই ফেরা কি কেবল দলীয় রাজনীতির পুনরাগমন, নাকি এর পিছনে রয়েছে বৃহত্তর কোনও রাজনৈতিক পরিকল্পনা?
দেশে ফিরে বাংলাদেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান বলেন,
“আমি আপনাদের সামনে স্পষ্টভাবে বলতে চাই—I have a plan.”
এই বক্তব্যের পর থেকেই তাঁর পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের মানুষ আজ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। মানুষ চায় যোগ্যতার ভিত্তিতে ন্যায্য অধিকার। তাঁর ভাষণে বারবার উঠে আসে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রসঙ্গ।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে তারেকের অবস্থান
তারেক রহমানের দেশে ফেরার আগেই তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ঘিরে যথেষ্ট আলোচনা হয়। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট করে বলেন—
“সবার আগে বাংলাদেশ। আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ। সেই স্বার্থ রক্ষা করেই আমি সিদ্ধান্ত নেব।”
এই বক্তব্যকে অনেকেই কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ, একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক হওয়া উচিত “জলের মতো পরিষ্কার”। অর্থাৎ, সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু তা হবে স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে—এমন বার্তাই দিতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তারেকের এই অবস্থান ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছেও যে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়ায়।

নয়াদিল্লির সতর্ক বার্তা
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষিতে শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক প্রতিক্রিয়া জানায়। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন,
“ভারত বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে। এই ঘটনাটিকে সেই প্রেক্ষিতেই দেখা উচিত।”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারত আপাতত সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে। সরাসরি কোনও রাজনৈতিক পক্ষ অবলম্বন না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেই জোর দিতে চাইছে নয়াদিল্লি।
‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তারেক?
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজরও কেড়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, এএফপি-র মতো সংবাদসংস্থা তাঁকে ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ বলেও উল্লেখ করেছে।
৬০ বছর বয়সি তারেক ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি সরাসরি দেশের রাজনীতিতে উপস্থিত না থাকলেও, বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব বরাবরই ছিল।
খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিএনপি যে তারেককেই ভবিষ্যতের মুখ হিসেবে সামনে আনতে চাইছে, তা এখন আর গোপন নয়। তাঁর দেশে ফেরার পর দলীয় কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। এক সময় যে জামাতের সঙ্গে জোট করে বিএনপি নির্বাচনে নেমেছিল, সেই জামাতই এবার বিএনপির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সেটাই এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক নির্ধারণ করবে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই সমীকরণকে যে আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, তা বলাই বাহুল্য।



