BLO Duty to Dog Census : পড়াশোনা, পরীক্ষা, খাতা দেখা, মিড-ডে মিলের নজরদারি, নির্বাচন সংক্রান্ত বুথ লেভেল অফিসারের (BLO) ডিউটি—এই সব সামলাতেই নাজেহাল স্কুলের শিক্ষকরা। তার উপর এবার যুক্ত হল একেবারে নতুন দায়িত্ব। এবার পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে পথকুকুর গোনার কাজ করতে হবে শিক্ষকদের। এমনই নির্দেশিকা জারি করেছে পুরসভা। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষক মহল।
ঘটনাটি বিহারের রোহতাস জেলার সাসারাম পুরসভাকে কেন্দ্র করে। পুরসভার তরফে জেলার সমস্ত স্কুলে একটি নোটিস পাঠানো হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, প্রতিটি স্কুল থেকে একজন করে শিক্ষককে নোডাল অফিসার হিসেবে মনোনীত করতে হবে। ওই নোডাল অফিসারের মূল দায়িত্ব হবে স্কুল চত্বর এবং তার আশপাশের এলাকায় থাকা পথকুকুরদের সংখ্যা, অবস্থা ও আচরণ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্কুল এলাকায় কতগুলি পথকুকুর রয়েছে, তারা অসুস্থ কি না, আক্রমণাত্মক আচরণ করছে কি না, টিকাকরণ হয়েছে কি না—এই সমস্ত তথ্য রিপোর্ট আকারে পুরসভাকে জমা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, পথকুকুর নিয়ন্ত্রণে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, সে সম্পর্কেও মতামত দিতে বলা হয়েছে শিক্ষক নোডাল অফিসারদের। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পুরসভা ভবিষ্যতে ডগ পাউন্ড বা আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা নেবে।
এই নির্দেশ সামনে আসতেই শিক্ষক সমাজে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শিক্ষকদের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই তাঁদের উপর একাধিক অশিক্ষাগত কাজের চাপ রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে শুরু করে জাতিভিত্তিক সমীক্ষা—প্রায় সারাবছরই কোনও না কোনও সরকারি কাজে তাঁদের যুক্ত করা হয়। এর ফলে ক্লাসরুমে পড়ানোর সময়ই পাওয়া যাচ্ছে না।
একজন শিক্ষক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমরা কি শিক্ষক, না সব কাজের লোক? ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো ছাড়া এখন সব কাজই করতে হচ্ছে। কখনও BLO ডিউটি, কখনও সমীক্ষা, এবার আবার কুকুর গোনা! তাহলে পড়াশোনার দায়িত্ব কে নেবে?”
আর এক শিক্ষক জানান, স্কুলে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত এমনিতেই খারাপ। তার উপর যদি দিনের পর দিন শিক্ষকরা ক্লাসের বাইরে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিক্ষার মান কীভাবে বজায় থাকবে—সেই প্রশ্ন উঠছেই।
শিক্ষক সংগঠনগুলিরও দাবি, এই ধরনের নির্দেশ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে। তাঁদের মতে, প্রশাসনিক কাজের জন্য আলাদা কর্মী থাকা উচিত। শিক্ষকদের দিয়ে সব কাজ করানোর এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার।
তবে পুরসভার বক্তব্য একেবারে ভিন্ন। সাসারাম পুরসভার কমিশনার জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের গাইডলাইন মেনেই এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে। তাঁর কথায়, “পথকুকুরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মানুষের নিরাপত্তা ও পশু কল্যাণ—দুটোই নিশ্চিত করতে চাই। সেই কারণেই স্থানীয় স্তরে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। স্কুলগুলো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই তাদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।”
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, শহরে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে একটি স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে অসুস্থ ও আক্রমণাত্মক কুকুরদের রাখা হবে, পাশাপাশি টিকাকরণ ও নির্বীজনের ব্যবস্থাও করা হবে। এই পুরো প্রকল্পের ভিত্তি হবে শিক্ষকদের দেওয়া রিপোর্ট।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই দায়িত্ব কি আদৌ শিক্ষকদের উপর চাপানো উচিত? শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষকদের মূল কাজ—পড়ানো—সেটার উপরই জোর দেওয়া উচিত। অন্য সব প্রশাসনিক কাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকা দরকার।
সব মিলিয়ে, পথকুকুর গণনার এই নির্দেশ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একদিকে পুরসভার যুক্তি প্রশাসনিক প্রয়োজন, অন্যদিকে শিক্ষক সমাজের অভিযোগ—তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও মূল দায়িত্বকে ক্রমশ উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর।



