Third World War : বিশ্ব রাজনীতির আকাশে ফের ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধের কালো মেঘ। একের পর এক সংঘর্ষ, শক্তিধর দেশগুলোর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য লড়াই, আর কূটনৈতিক ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি সত্যিই অনিবার্য হয়ে উঠছে? বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতেই যদি বড়সড় কোনও সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তার প্রভাব যে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্য। দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)-এর মধ্যে সম্পর্ক এখন তলানিতে। ইয়েমেনকে ঘিরে এই দুই আরব পরাশক্তির স্বার্থের সংঘাত ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন—এই সংঘাত যদি সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে আমেরিকা সহ আরও একাধিক শক্তিধর দেশ জড়িয়ে পড়তে পারে।
মিত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী—কীভাবে বদলাল সম্পর্ক?
এক সময় ইয়েমেনে হাউথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই শুরু করেছিল। লক্ষ্য ছিল, ইরানপন্থী শক্তির প্রভাব ঠেকানো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই যৌথ অবস্থান ভেঙে পড়ে। এখন ইয়েমেন কার্যত দুই আরব ‘ভাই’-এর ছায়াযুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় এই উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC)-এর একটি ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান। এই হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কুড়িরও বেশি মানুষ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়েমেন: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আন্তর্জাতিক শক্তির দাবার বোর্ড
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন এখন আর শুধু গৃহযুদ্ধের দেশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থের সংঘর্ষস্থল। তেলসমৃদ্ধ হাদরামৌত ও মাহরা প্রদেশকে ঘিরেই মূলত সৌদি আরব ও আমিরাতের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। সৌদি আরব চায়, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমির সরকার টিকে থাকুক। অন্যদিকে, আমিরাত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে সমর্থন করছে পৃথক দক্ষিণ ইয়েমেন রাষ্ট্র গঠনের দাবিদার STC-কে।
এই অবস্থায় STC-র প্রভাব বাড়তে থাকলে তা সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে রিয়াধ। ফলত, সংঘর্ষ ক্রমেই আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের অস্বস্তি এবং গোপনীয়তা
এই সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান এখন পড়েছে চরম কূটনৈতিক অস্বস্তিতে। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব, অন্যদিকে বড় বিনিয়োগকারী সংযুক্ত আরব আমিরাত—দু’পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখা ইসলামাবাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে, ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানে সংবাদ প্রকাশে সেনাবাহিনীর তরফে কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। অভিযোগ, আমিরাতের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখতে চাইছে জেনারেল আসিম মুনিরের প্রশাসন। ফলে এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন অস্থিরতা তৈরি করছে।
আমেরিকা কি জড়িয়ে পড়বে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংঘাতে কি শেষ পর্যন্ত আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে? সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতও মার্কিন অস্ত্র ও প্রযুক্তির অন্যতম বড় ক্রেতা। দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকার নিরপেক্ষ থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে রাশিয়া ও চিনও নিজেদের স্বার্থে অবস্থান নিতে পারে। আর তখনই আঞ্চলিক যুদ্ধ রূপ নিতে পারে বৈশ্বিক সংঘাতে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কতটা বাস্তব?
যদিও এখনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে—এমন দাবি করা অতিরঞ্জিত হতে পারে, তবে একথা অস্বীকার করা যায় না যে বিশ্ব ভয়াবহ এক অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার আঁচ ইউরোপ, এশিয়া এমনকি আমেরিকাতেও লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতেই বিশ্ব রাজনীতি এক অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। কূটনৈতিক সমাধান না হলে, সামরিক সংঘাত যে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।



