UGC Act 2026 : যাঁরা একসময় নরেন্দ্র মোদীকে “ভগবান রামের স্বরূপ” বলে মেনে এসেছেন, আজ তাঁরাই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন—এই চিত্রটাই এখন দেশের নানা প্রান্তে সামনে আসছে। মোদীর ছবি ছেঁড়া, কালি মাখানো, এমনকি কোথাও কোথাও জুতো মারার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়, এই প্রতিবাদের বড় অংশটাই হচ্ছে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি উত্তর প্রদেশে। প্রশ্ন উঠছে—মোদীর নিজের ভক্তরাই কেন আজ তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে পথে নামছেন?
এই অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে UGC Act 2026, বা পূর্ণ নাম অনুযায়ী “Promotion of Equity in Higher Education Institutions Regulations, 2026”। এই নতুন নির্দেশিকা ঘিরেই তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা।
কেন হঠাৎ এত ক্ষোভ মোদী সরকারের বিরুদ্ধে?
বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, UGC-এর এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আবারও জাত ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজন জোরদার হবে। বহু বছর ধরে যে ‘জাতিভেদহীন সমাজ’-এর স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, এই নির্দেশিকা নাকি তার ঠিক উল্টো পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুধু বিরোধী দল নয়, বিজেপির অন্দরের বহু সমর্থকও এই নির্দেশিকার বিরোধিতায় সরব হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়ো ও পোস্টে দেখা যাচ্ছে—
- বাড়ির ছাদ থেকে বিজেপির পতাকা নামানো হচ্ছে
- মোদী ও অমিত শাহের ছবি পোড়ানো হচ্ছে
- “হিন্দু সমাজকে ভাগ করা হচ্ছে” বলে স্লোগান উঠছে
অনেকে বলছেন, এই ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি আদতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
যোগী আদিত্যনাথ বনাম কেন্দ্র? জল্পনা তুঙ্গে
এই আবহে আরও জল্পনা তৈরি করেছে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ভূমিকা। যদিও প্রকাশ্যে তিনি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলেননি, তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য ও প্রশাসনিক কিছু পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন—এই ইস্যুতে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে প্রতিবাদের মাত্রা দেখে প্রশ্ন উঠছে, বিজেপির সবচেয়ে বড় ভোটব্যাঙ্কেই কি ফাটল ধরছে?
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে বড় মোড়
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বড় ধাক্কা খেল কেন্দ্র ও ইউজিসি। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট UGC Act 2026-এর উপর স্থগিতাদেশ জারি করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই নির্দেশিকায় এমন কিছু ধারা রয়েছে যা কার্যকর হলে সমাজে সুদূরপ্রসারী ও বিপজ্জনক প্রভাব পড়তে পারে।
আদালত কেন্দ্র ও ইউজিসি-কে নোটিস পাঠানোর পাশাপাশি জানায়, আপাতত ২০১২ সালের পুরনো নির্দেশিকাই বহাল থাকবে। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত।
“সমাজ টুকরো হয়ে যাবে”—প্রধান বিচারপতির কড়া মন্তব্য
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“এই নির্দেশিকায় ৪–৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। এগুলির সমাধান না হলে সমাজে মারাত্মক বিভাজন তৈরি হবে।”
বেঞ্চের অপর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আরও এক ধাপ এগিয়ে আমেরিকার উদাহরণ টেনে বলেন,
“আমরা এমন পরিস্থিতি চাই না যেখানে সাদা ও কালো চামড়ার পড়ুয়াদের জন্য আলাদা স্কুল থাকবে। ভারতের ঐক্য আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।”
হোস্টেল বিভাজন নিয়ে তীব্র আপত্তি
নির্দেশিকায় জাতি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক আলাদা হোস্টেল বা আবাসনের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি আপত্তি আদালতের। প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন,
“স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর আমরা কি আবার পিছনের দিকে হাঁটছি? আমরা নিজেরাও হোস্টেলে থেকেছি, যেখানে সব সম্প্রদায়ের পড়ুয়ারা একসঙ্গে থাকত।”
তিনি আরও বলেন, আন্তঃবর্ণ বিবাহকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে দেশ যেখানে এগোচ্ছে, সেখানে আবার জাতিভিত্তিক বিভাজনের পথে ফেরা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিতর্কের মূল কেন্দ্র—Section 3(1)(c)
আবেদনকারীদের মূল আপত্তি ছিল নির্দেশিকার Section 3(1)(c) ধারা নিয়ে। তাঁদের দাবি, এই ধারার ভাষা অস্পষ্ট এবং ভবিষ্যতে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রবল। বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন তোলেন,
“২০১২ সালের নির্দেশিকায় যেখানে বৈষম্যের সংজ্ঞা পরিষ্কার ছিল, সেখানে নতুন করে এই ধারা যুক্ত করার প্রয়োজন কী?”
সামনে কী?
আপাতত সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশে স্বস্তিতে শিক্ষামহল ও বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তবে রাজনৈতিক মহলের নজর এখন একটাই প্রশ্নে—
👉 পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্র কি এই নির্দেশিকা সংশোধন করবে, নাকি সংঘাত আরও বাড়বে?
UGC Act 2026 শুধুই একটি শিক্ষা-নীতি নয়, বরং এটি এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে—যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



