World Politics : বিশ্ব রাজনীতির অন্দরমহলে এমন কিছু চুক্তি হয়, যার খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় অনেক পরে—বা পৌঁছায়ই না। কিন্তু সম্প্রতি সামনে আসা কিছু তথ্য ও বিশ্লেষণ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সত্যিই কি ইউক্রেনকে ঘিরে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলাকে কৌশলগত দর কষাকষির মুদ্রা বানানো হয়েছিল? নাকি এই সবই কূটনৈতিক গুঞ্জন ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ফল?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার সম্পর্ক নিয়ে বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা রয়েছে। সেই জল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে একাধিক রিপোর্ট ও মন্তব্য, যেখানে দাবি করা হয়েছে—২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে একটি নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল।
🕵️♀️ গোপন সমঝোতার ইঙ্গিত কোথা থেকে এল?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাক্তন উপদেষ্টা ও রাশিয়া-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফিয়োনা হিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প জমানায় রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে একে অপরের আঞ্চলিক প্রভাব মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
এই সময়েই ভেনেজুয়েলায় মার্কিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্রিয়তা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত—যা অনেক বিশ্লেষকের চোখে অস্বাভাবিক।
🇻🇪 ভেনেজুয়েলা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভেনেজুয়েলা শুধু একটি লাতিন আমেরিকার দেশ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুতের অধিকারী। দীর্ঘদিন ধরেই এই দেশটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। হুগো চাভেজ ও পরবর্তীকালে নিকোলাস মাদুরোর আমলে ভেনেজুয়েলা রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া যদি লাতিন আমেরিকায় নিজের প্রভাব কিছুটা শিথিল করে, তাহলে আমেরিকার জন্য ভেনেজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার অনেক সহজ হয়ে যায়। এই কারণেই অনেকেই মনে করছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধার বিনিময়ে ভেনেজুয়েলা নিয়ে মার্কিন পদক্ষেপে মস্কোর নীরব সম্মতি থাকতে পারে।
🇺🇦 ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া: রাশিয়ার মূল লক্ষ্য?
রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। কৃষ্ণ সাগরে প্রবেশাধিকার, নৌঘাঁটি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ।
কূটনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, রাশিয়া চেয়েছিল ইউক্রেন প্রশ্নে আমেরিকার কঠোর অবস্থান কিছুটা নরম হোক। এর বিনিময়ে তারা পশ্চিম গোলার্ধে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
🧩 মনরো ডকট্রিন ও আধুনিক বাস্তবতা
এই আলোচনায় বারবার উঠে আসছে মনরো ডকট্রিন—যে নীতি অনুযায়ী আমেরিকা লাতিন আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে দেখে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ভূরাজনীতিতে এই নীতিই নতুন করে কার্যকর হচ্ছে, যদিও অনেক বেশি গোপন ও কৌশলী উপায়ে।
রাশিয়া ইউরোপের পূর্ব অংশে নিজের আধিপত্য চায়, আর আমেরিকা চায় পশ্চিম গোলার্ধে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে। এই সমীকরণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে ‘নীরব বোঝাপড়া’-র তত্ত্ব।
❓ অপহরণ, অভিযান ও সন্দেহ
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রেসিডেন্টকে ঘিরে রহস্যজনক পরিস্থিতি এবং মার্কিন ভূমিকা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। যদিও কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা সরাসরি অপহরণের অভিযোগ নিশ্চিত করেনি, তবুও ঘটনাগুলির ধারাবাহিকতা সন্দেহ উসকে দিচ্ছে।
রাশিয়ার তরফে এই বিষয়ে প্রকাশ্য আপত্তি বা কড়া প্রতিক্রিয়া না আসাও অনেকের চোখে তাৎপর্যপূর্ণ।
⚖️ সত্য না জল্পনা—কোথায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব?
এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা কঠিন, আদৌ কোনও লিখিত বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছিল কি না। তবে একাধিক ঘটনার সমাপতন, কূটনৈতিক নীরবতা এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই শক্তির খেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারা? উত্তর একটাই—সাধারণ মানুষ। ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত নাগরিক থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত মানুষ—সবাই এই ছায়াযুদ্ধের মাশুল দিচ্ছে।
সময়ই বলবে, এই তথাকথিত গোপন সমঝোতা ইতিহাসের পাতায় সত্য হিসেবে লেখা হবে, নাকি কেবলই একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।



