ভ্লাদিমির পুতিন—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, বিশ্ব রাজনীতির এক বিতর্কিত মুখ, এবং একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই রহস্যে ঢাকা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বহুবারই শোনা গেছে তাঁর প্রেমজ জীবন, সম্পর্ক, গোপন কন্যা বা তরুণীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার নানা অভিযোগ। তবে ক্রেমলিন কখনও এসব বিষয়ে মুখ খোলে না। বরং সাংবাদিকরা এই বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান করলেই—তাদের সামনে হাজির হন গোয়েন্দারা।
এই বাস্তবতার আরও স্পষ্ট উদাহরণ সামনে আসে ২০২১ সালের জুন মাসে।
🔶 সকাল ছ’টায় দরজায় এফএসবি—সাংবাদিকের দুঃস্বপ্ন
মস্কোর চের্তানোভো এলাকার এক ফ্ল্যাটে ঘুমোচ্ছিলেন সাংবাদিক রোমান বাদানিন। ভোরবেলা হঠাৎ তাঁর দরজার ঘণ্টা বাজতে থাকে। দরজা খুলতেই তিনি দেখেন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির আধা ডজনেরও বেশি আধিকারিক দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে তল্লাশি পরোয়ানা।
পরবর্তী ছ’ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চলে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে। তাঁর স্ত্রীর গাড়িতেও তল্লাশি ঘটে। শেষে তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
বাদানিনের “অপরাধ” ছিল মাত্র একটি—তিনি পুতিনের কথিত “অবৈধ কন্যা”-র সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিলেন।
বাদানিন পরে বলেন—
“রাশিয়াতে পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলা মানে নিষিদ্ধ অঞ্চলে পা রাখা। সাংবাদিকদের মধ্যে বহুল প্রচলিত কথা—‘ওর পরিবারের দিকে হাত তুলো না।’”
বর্তমানে তিনি পরিবার-সহ ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাসনে বাস করছেন।

🔶 বই প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন
বাদানিন ও তাঁর সহকর্মী মিখাইল রুবিন লিখেছেন একটি বই—
‘The Tsar Himself: How Vladimir Putin Deceived Us All’
বইটিতে প্রকাশিত হয়েছে পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, প্রেম, পরকীয়া ও গোপন রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কিত বিস্ফোরক দাবি।
তাঁরা জানান, পুতিনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি তরুণী, নর্তকী ও স্ট্রিপারদের সান্নিধ্যে সময় কাটাতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের কুখ্যাত সংস্থা কেজিবির দায়িত্বে থাকার সময় থেকেই এই অভ্যাস গড়ে ওঠে বলে তাঁদের দাবি।
🔶 স্ট্রিপ ক্লাব ‘লুনা’ — পুতিনের গোপন আড্ডাখানা?
বইয়ে লেখা হয়েছে—
সেন্ট পিটার্সবার্গে ‘লুনা’ নামে একটি স্ট্রিপ ক্লাব ছিল, যেখানে পুতিন নিয়মিত যেতেন। দ্বিতীয় তলায় তাঁর জন্য ছিল একটি ব্যক্তিগত রুম, যেখানে নর্তকীদের সঙ্গে তিনি সময় কাটাতেন।
ক্লাবটির দেখভাল করত এক অপরাধচক্র, যা পুতিনের দেহরক্ষী রোমান সেপভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।
🔶 সাফাই কর্মী থেকে অলিম্পিক তারকা—বহু মহিলার সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ
১️⃣ স্বেতলানা ক্রিভোনোগিখ — সাফাইকর্মী থেকে কোটিপতি
১৯৯৯ সালে পুতিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড় শুরু করার সময় স্বেতলানার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে দাবি বইটিতে। তাঁদের একটি কন্যা সন্তানের কথাও উল্লেখ আছে। যদিও ক্রেমলিন কখনো এমন দাবি স্বীকার করেনি।
২️⃣ আলিনা কাবায়েভা — অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী জিমন্যাস্ট
২০০৪ সালে পুতিনের জীবনে আসেন আলিনা কাবায়েভা। তাঁর নগ্ন ফটোশুট একসময় দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
২০০৮ সালে মস্কোর একটি ট্যাবলয়েড সংবাদ প্রকাশ করে—পুতিন এবং কাবায়েভার বিয়ে হতে চলেছে।
এরপরই সংবাদপত্রটির ওপর এফএসবি অভিযান চালায়।
সম্পাদককে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়, এবং শেষমেশ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
৩️⃣ রাজনৈতিক মহলের দাবি—‘বিবাহ’ পুতিনের কাছে অবাধ প্রতিষ্ঠান
বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে—
পুতিনের চেনা মহলে নাকি বিবাহ মানে “অবাধ সম্পর্ক”। একাধিক প্রেম, প্রতারণা বা সম্পর্ক ভাঙা—এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হয়।

🔶 স্ত্রী লিউদমিলার সঙ্গে তিক্ত অধ্যায়
পুতিনের প্রথম স্ত্রী লিউদমিলা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করতেন, স্বামী কাজের অজুহাতে বাড়ি ফিরতেন না।
তিনি এক বন্ধুকে নাকি বলেছিলেন—
“ও যেন ভ্যাম্পায়ার।”
২০১৩ সালে তাঁরা প্রকাশ্যে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন, ২০১৪ সালে তা আনুষ্ঠানিক হয়।
🔶 বর্তমান প্রেমিকা?—৩২ বছরের ছোট “বার্বি”?
ইউক্রেনের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে—
বর্তমানে ৭১ বছরের পুতিন নাকি প্রেম করছেন ৩৯ বছর বয়সী ইতিহাসবিদ একাতেরিনা “কাতিয়া” মিজুলিনার সঙ্গে।
তিনি নাকি পুতিন প্রশাসনের সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ করেন—রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্যগুলো মুছে ফেলার দায়িত্ব তাঁর।
তাঁকে “পুতিনের বার্বি” বলেও ডাকেন অনেকে।
অবশ্য এসব দাবি এখনো যাচাই হয়নি; ক্রেমলিন এসব বিষয়ে নীরব।
🔶 প্রশ্ন রয়ে যায়—পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন কি সত্যিই নিষিদ্ধ এলাকা?
রাশিয়ার সাংবাদিকদের মতে—
পুতিনের প্রেমজীবন বা পরিবারের বিষয়ে অনুসন্ধান করা মানেই ঝুঁকি নেওয়া।
বাদানিনের ঘটনা যেন সেই কঠিন সতর্কবার্তারই প্রতিফলন।
বইয়ের তথ্য সত্য কি না—তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন আজও সবচেয়ে রহস্যময় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক অনুসন্ধানযোগ্য বিষয়।



