আজকের দিনে হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকাল থেকে রাত—বন্ধু, আত্মীয়, অফিসের কাজ, ব্যবসা, পড়াশোনা—সব ক্ষেত্রেই এই মেসেজিং অ্যাপের ব্যবহার। সহজ ব্যবহারযোগ্যতা এবং দ্রুত যোগাযোগের সুবিধার কারণে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন হোয়াটসঅ্যাপে নির্ভরশীল।
কিন্তু অনেকেই জানেন না, হোয়াটসঅ্যাপে কিছু কাজ করলে তা সরাসরি আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। শুধু অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়াই নয়, কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে জেল কিংবা মোটা অঙ্কের জরিমানাও। বছরের পর বছর হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করলেও এই আইনি দিকগুলি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন বহু মানুষ।
তাই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করার সময় কোন কোন ভুল একেবারেই করা উচিত নয়, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
ভুয়ো খবর বা গুজব ছড়ালে আইনি বিপদে পড়তে পারেন
হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড করা বার্তা খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু সেই বার্তায় যদি ভুল তথ্য, ভুয়ো খবর বা গুজব থাকে, তাহলে তা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই খবর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে, দাঙ্গা উসকে দেয় বা কারও মানহানি ঘটায়, তাহলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি আইন (IT Act) এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) একাধিক ধারায় ভুয়ো খবর ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র একটি ফরোয়ার্ড করা মেসেজের জন্যই মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাই “আমি তো শুধু ফরোয়ার্ড করেছি” —এই যুক্তি আইনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

গ্রুপে উস্কানিমূলক বা ঘৃণামূলক কনটেন্ট শেয়ার করা বিপজ্জনক
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছবি, ভিডিও, মিম বা অডিও শেয়ার করা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্মীয়, জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কনটেন্ট শেয়ার করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কোনও সম্প্রদায়, ধর্ম বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য, বিদ্বেষমূলক পোস্ট বা উস্কানিমূলক ভিডিও ছড়ালে তা ঘৃণামূলক অপরাধ (Hate Crime) হিসেবে ধরা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার এবং জেল পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি গ্রুপ অ্যাডমিনও অনেক ক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো অপরাধ
হোয়াটসঅ্যাপে কাউকে হত্যা, ক্ষতি, অপহরণ বা মানহানির হুমকি দিলে সেটি নিছক মজা হিসেবে দেখা হয় না। আইন এই ধরনের হুমকিমূলক বার্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।
ভুক্তভোগী ব্যক্তি যদি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন, তাহলে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, স্ক্রিনশট এবং কল রেকর্ডকে ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রমাণ মিললে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
শিশুদের সংক্রান্ত অনুপযুক্ত কনটেন্ট শেয়ার করলে কঠোর শাস্তি
শিশুদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে আইন অত্যন্ত কঠোর। হোয়াটসঅ্যাপে শিশু যৌন নির্যাতন, অশালীন ছবি বা শিশুদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও অনুপযুক্ত কনটেন্ট শেয়ার করা মারাত্মক অপরাধ।
এই ধরনের অপরাধ POCSO আইন ও সাইবার ক্রাইম আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য। শুধু যিনি কনটেন্ট তৈরি করেছেন, তা নয়—যিনি ফরোয়ার্ড করেছেন বা সংরক্ষণ করেছেন, তিনিও সমানভাবে দোষী হতে পারেন। এই ধরনের কনটেন্ট দেখলে অবিলম্বে হোয়াটসঅ্যাপ বা সাইবার ক্রাইম সেলে রিপোর্ট করা উচিত।

হোয়াটসঅ্যাপের নীতি ভাঙলে অ্যাকাউন্ট ব্লক হতে পারে
আইনি শাস্তির পাশাপাশি, হোয়াটসঅ্যাপ নিজস্ব নীতিমালা ভঙ্গ করলে আপনার অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে ব্লকও করে দিতে পারে। স্প্যাম মেসেজ পাঠানো, বাল্ক ফরোয়ার্ড, ভুয়ো লিঙ্ক শেয়ার করা বা প্রতারণামূলক কার্যকলাপ ধরা পড়লে অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
একবার স্থায়ীভাবে ব্লক হলে সেই নম্বর দিয়ে আর হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
সতর্ক থাকুন, সচেতন থাকুন
মনে রাখবেন, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রতিটি মেসেজ, ছবি বা ভিডিও ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে থেকে যায়। সামান্য অসতর্কতা আপনার জীবনে বড় আইনি বিপদ ডেকে আনতে পারে।
✔ যাচাই না করে কোনও খবর ফরোয়ার্ড করবেন না
✔ সংবেদনশীল বা উস্কানিমূলক কনটেন্ট এড়িয়ে চলুন
✔ সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করবেন না
✔ শিশুদের সম্পর্কিত কনটেন্ট দেখলে সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করুন
সচেতন ব্যবহারই আপনাকে নিরাপদ রাখতে পারে।



