যেখানে একটি বাণিজ্যিক বাংলা বা হিন্দি সিনেমা নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে মাত্র ৫ হাজার টাকা বাজেটে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা তৈরি করে নজর কেড়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার দুই তরুণ। সীমিত অর্থ, অল্প জনবল এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছে তাঁদের সিনেমা ‘সংযোগ’, যা ইতিমধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে।
নির্মাতাদের বক্তব্য, অর্থের অভাবকে বাধা না ভেবে তাঁরা সেটিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল প্রমাণ করা—সৃজনশীলতা, পরিকল্পনা এবং ইচ্ছাশক্তি থাকলে অল্প বাজেটেও একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব।
কারা তৈরি করেছেন ‘সংযোগ’?
এই ছবির প্রযোজনা করেছেন উত্তর ২৪ পরগনার মথুরাপুরের নির্মাল্য হালদার। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বারাসতের রীতেশ দত্ত। দু’জনেই স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন।
প্রযোজক না পাওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেই ছবির পরিকল্পনা, শুটিং এবং পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান তাঁরা।
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় শেষ শুটিং
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ছবিটির সম্পূর্ণ শুটিং শেষ হয়েছে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
উত্তর ২৪ পরগনার গুমা এলাকায় সীমিত লোকেশন ব্যবহার করে শুটিং করা হয়। পুরো ইউনিটে ছিলেন মাত্র ছয়জন সদস্য। আগে থেকেই বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি থাকায় খুব কম সময়ের মধ্যেই সমস্ত দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
কোথায় খরচ হয়েছে ৫ হাজার টাকার বাজেট?
নির্মাতাদের দাবি, ছবির মোট বাজেট ছিল প্রায় ৫ হাজার টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ৩,৯০০ টাকা ব্যয় হয়েছে ক্যামেরা ও আলোর সরঞ্জাম ভাড়ায়। বাকি অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে শিল্পীদের যাতায়াত এবং ন্যূনতম সম্মানীর জন্য।
এমনকি খরচ বাঁচাতে আলাদা ক্ল্যাপারবোর্ডও ব্যবহার করা হয়নি। পরিবর্তে সাধারণ একটি খাতায় শট নম্বর লিখেই শুটিং পরিচালনা করা হয়েছে।
কী ধরনের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা?
‘সংযোগ’ শুধুমাত্র একটি থ্রিলার নয়। নির্মাতাদের দাবি, ছবিতে রয়েছে থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন এবং পারিবারিক ড্রামার সংমিশ্রণ।
পোস্ট-প্রোডাকশনের বিভিন্ন ধাপে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে অডিও প্রসেসিং, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং কিছু প্রযুক্তিগত কাজে AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা।
ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে মোশন পোস্টার
ছবির প্রথম মোশন পোস্টার এবং একটি গান ইতিমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।
বর্তমানে ছবির মুক্তির প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহালয়ার আগে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। জেলার কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। তবে মুক্তির তারিখ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে বাজেট সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় মাত্র কয়েক হাজার টাকায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিল, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং দলগত সমন্বয় থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও নতুন কিছু করার সুযোগ রয়েছে।
যদিও ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্য বা দর্শক গ্রহণযোগ্যতা মুক্তির পরই স্পষ্ট হবে, তবু কম বাজেটে চলচ্চিত্র নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ হিসেবে ‘সংযোগ’ ইতিমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছে।
শেষ কথা
কোটি টাকার প্রযোজনার ভিড়ে মাত্র ৫ হাজার টাকার বাজেট নিয়ে তৈরি ‘সংযোগ’ নিঃসন্দেহে বাংলা স্বাধীন চলচ্চিত্রের একটি ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা। সীমিত সামর্থ্যকে শক্তিতে পরিণত করে উত্তর ২৪ পরগনার দুই তরুণ যে উদাহরণ তৈরি করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দর্শকদের মন কতটা জয় করতে পারে এই ব্যতিক্রমী বাংলা ছবি।



