Digital Fraud India : এক ক্লিকেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা। অচেনা নম্বর থেকে ফোন, ভুয়ো লিঙ্ক, কিংবা একটু অসাবধানতায় শেয়ার হয়ে যাওয়া ওটিপি—ডিজিটাল প্রতারণার এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আজ নতুন কিছু নয়। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ অনলাইনে প্রতারিত হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হারাচ্ছেন। এতদিন পর্যন্ত এই ধরনের ঘটনার পর ভুক্তভোগীদের ভরসা ছিল শুধু ব্যাঙ্কের অভিযোগ প্রক্রিয়া আর পুলিশের তদন্ত। কিন্তু এবার সেই অসহায় গ্রাহকদের পাশে দাঁড়াল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)।
ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। বৃহস্পতিবার RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানিয়েছেন, ডিজিটাল জালিয়াতির শিকার হলে গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভুল করে ওটিপি শেয়ার করে ফেললেও এই ক্ষতিপূরণের সুযোগ থাকছে। যা আগে ভাবাই যেত না।
কোন তহবিল থেকে মিলবে এই টাকা?
RBI জানিয়েছে, এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে তাদের অধীনস্থ ‘ডিপোজিটর এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস (DEA) ফান্ড’ থেকে। এই ফান্ড মূলত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে থাকা দাবিহীন ব্যাঙ্ক আমানত থেকে তৈরি। বর্তমানে এই তহবিলে জমা রয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা।
RBI-র ডেপুটি গভর্নর স্বামীনাথন জে জানিয়েছেন, এই বিপুল অঙ্কের তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিলে দেশের আর্থিক ভারসাম্যে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা ফিরবে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপর।
সব ক্ষেত্রে কি ক্ষতিপূরণ মিলবে?
এই সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রেখেছে RBI। কারণ, গ্রাহকদের সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিতে নারাজ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। RBI-র মতে, ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকেরও কিছুটা দায়বদ্ধতা বা “skin in the game” থাকা জরুরি।
শর্তগুলি হল—
1️⃣ জীবনে মাত্র একবার এই ক্ষতিপূরণের সুযোগ মিলবে
2️⃣ জালিয়াতির পেছনে গ্রাহকের কোনও অসৎ উদ্দেশ্য বা যোগসাজশ থাকলে ক্ষতিপূরণ মিলবে না
3️⃣ প্রতারণায় যে অর্থ খোয়া গেছে, তার ১৫ শতাংশ গ্রাহককেই বহন করতে হবে
4️⃣ বাকি ৮৫ শতাংশ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে, তবে সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা
অর্থাৎ, যদি কেউ ৩০ হাজার টাকা খোয়ান, তাহলে তার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কেন ২৫ হাজার টাকার সীমা?
ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে হওয়া ডিজিটাল প্রতারণার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতির অঙ্ক ৫০ হাজার টাকার নিচে। ফলে ২৫ হাজার টাকার এই সুরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত গ্রাহকদের জন্য বড় স্বস্তি আনবে।
গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন,
“যদি লেনদেনটি অনিচ্ছাকৃত হয় এবং গ্রাহক প্রতারণার শিকার হন, তাহলে কোনও অহেতুক জটিলতা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।”
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা
ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবীণ নাগরিকরা। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই RBI আরও কিছু অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবছে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
- বড় অঙ্কের টাকা ট্রান্সফারের আগে অতিরিক্ত যাচাইকরণ
- টাকা ক্রেডিট বা ডেবিট হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সময়ের ব্যবধান
- সন্দেহজনক লেনদেন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ট সিস্টেম
খুব শীঘ্রই এই সংক্রান্ত খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে, এমনটাই জানিয়েছে RBI।
সাধারণ মানুষের জন্য কতটা স্বস্তি?
ডিজিটাল লেনদেন এখন দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। UPI, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। এই পরিস্থিতিতে RBI-র এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি বিশ্বাস ফেরানোর পদক্ষেপ।
যদিও ২৫ হাজার টাকা সম্পূর্ণ ক্ষতির তুলনায় অনেক সময়ই কম, তবুও নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য এটি একটি বড় ভরসা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ব্যাঙ্কগুলিকেও আরও শক্তিশালী সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য করবে।
উপসংহার
ডিজিটাল প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও, তার ক্ষতি লাঘব করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। RBI-র এই নতুন ক্ষতিপূরণ নীতি সেই দিকেই এক বড় পদক্ষেপ। তবে গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে—অচেনা লিঙ্ক, কল বা ওটিপি শেয়ার করার আগে হাজার বার ভাবাই একমাত্র আসল সুরক্ষা।



