ভারতীয় সমাজে সোনার গুরুত্ব শুধুমাত্র অলংকার বা বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সোনা নিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিয়ে, উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই সোনার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, দেশের বিপুল পরিমাণ সোনা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকায় তা অর্থনীতির জন্য কার্যকর সম্পদে পরিণত হচ্ছে না।
বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি অনুমান অনুযায়ী, ভারতীয় পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মন্দিরগুলির কাছে মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টনেরও বেশি সোনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের নিরিখে এই সম্পদের আর্থিক মূল্য কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বিশাল সম্পদ, যা বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লকার, আলমারি বা ভল্টে সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র সরকার বহুদিন ধরেই সোনাকে অর্থনীতির মূল প্রবাহে আনার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কাজ করছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো Gold Monetisation Scheme বা গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানাধীন সোনাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত করা।
সরকারের যুক্তি হলো, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা আমদানিকারক দেশ। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে হয়। এর ফলে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি বা Current Account Deficit-এর ওপর চাপ তৈরি হয়। যদি দেশের অভ্যন্তরে থাকা সোনার একটি অংশ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, তাহলে আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে।
Gold Monetisation Scheme-এর আওতায় নাগরিকরা নির্দিষ্ট শর্তে তাদের সোনা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে জমা রাখতে পারেন। সোনা যাচাই ও মূল্যায়নের পর তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং জমাদাতারা নির্দিষ্ট হারে সুদের সুবিধাও পেতে পারেন। স্কিমটির উদ্দেশ্য ছিল সোনাকে শুধুমাত্র অলংকার হিসেবে সংরক্ষণ না করে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা।
তবে বাস্তবে এই প্রকল্প প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মানুষের মানসিকতা ও বিশ্বাসের বিষয়টিকে উল্লেখ করেন। অধিকাংশ ভারতীয় পরিবার সোনাকে কেবল একটি আর্থিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং পারিবারিক ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ হিসেবে দেখে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রজন্মান্তরে ব্যবহৃত গহনা বা মূল্যবান সামগ্রী ব্যাংকে জমা দিতে মানুষ স্বস্তি বোধ করেন না।
এছাড়া, সোনা জমা দেওয়ার পর সেটি গলিয়ে পুনঃব্যবহারযোগ্য আকারে রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টিও অনেকের মধ্যে অনীহা তৈরি করে। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে আগ্রহ থাকলেও বাস্তব অংশগ্রহণের হার সীমিত থেকেছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, যদি দেশের বিপুল পরিমাণ সোনার সামান্য অংশও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে একাধিক ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। সোনা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং আর্থিক খাতে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হতে পারে।
তবে সমালোচকরাও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র জনগণের কাছে থাকা সোনাকে অর্থনীতির মূল প্রবাহে আনার ওপর জোর দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রকল্প সফল করতে হলে জনগণের আস্থা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বচ্ছ নীতি, সহজ প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ ধীরে ধীরে এই ধরনের স্কিমের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন। অন্যথায়, বিপুল পরিমাণ সোনা ব্যক্তিগত সংরক্ষণেই থেকে যাবে এবং অর্থনীতিতে তার সম্ভাব্য অবদান সীমিত থাকবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের ঘরে ঘরে থাকা সোনা নিঃসন্দেহে একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ। তবে এই সম্পদকে কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন। আগামী দিনে কেন্দ্রের নীতিগুলি কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই বিপুল সোনার ভাণ্ডার দেশের অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।



