ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ হতে চলেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মানববিহীন যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে, আর সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নতুন উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)। একসঙ্গে ৫০টি ড্রোনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম একটি উন্নত ড্রোন সোয়ার্ম (Drone Swarm) তৈরির প্রকল্প শুরু হয়েছে বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা গিয়েছে।
এই প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধুমাত্র নজরদারি নয়, বরং জটিল ইলেকট্রনিক যুদ্ধপরিস্থিতিতেও সমন্বিতভাবে মিশন পরিচালনা করা। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন সোয়ার্ম প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কী এই নতুন DRDO ড্রোন সোয়ার্ম প্রকল্প?
DRDO যে প্রকল্পের জন্য শিল্প সংস্থা ও স্টার্টআপগুলির কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করেছে, তার নাম Development of Close Formation Flying of Multiple Drones।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একসঙ্গে ৫০টি ড্রোন নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে একই সময়ে উড়তে পারবে এবং একটি ইউনিট হিসেবে কাজ করবে।
সাধারণ ড্রোনের তুলনায় সোয়ার্ম প্রযুক্তির বিশেষত্ব হল, প্রতিটি ড্রোন আলাদা হলেও তারা পরস্পরের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করে একই মিশন সম্পন্ন করে। ফলে একটি বা কয়েকটি ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো অপারেশন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
কেন এই প্রযুক্তিকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে?
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন সীমান্ত পরিস্থিতিতে ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ভারতও উন্নত মানববিহীন যুদ্ধব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ড্রোন সোয়ার্ম ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—
- সীমান্ত নজরদারি
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- লক্ষ্য নির্ধারণ
- ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার
- উদ্ধার অভিযান
- উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানববিহীন অপারেশন
কী কী প্রযুক্তিগত শর্ত দিয়েছে DRDO?
সরকারি নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পে অংশ নেওয়া সংস্থাগুলিকে বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত মান পূরণ করতে হবে।
প্রধান শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে—
- একসঙ্গে ৫০টি ড্রোন সমন্বিতভাবে উড়তে সক্ষম হতে হবে।
- ড্রোনগুলির মধ্যে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
- প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রবল বাতাসেও ফর্মেশন ধরে রাখতে হবে।
- ইলেকট্রনিক জ্যামিং-এর মধ্যেও যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
- ড্রোনগুলিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে সক্ষম হতে হবে।
এই শর্তগুলি পূরণ হলে প্রযুক্তিটি বাস্তব সামরিক অভিযানে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠবে।
পার্বত্য এলাকাতেও কাজ করবে এই ড্রোন
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলেও ড্রোনগুলির কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করা।
DRDO চেয়েছে, এই ড্রোনগুলি ৫,০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত কার্যকরভাবে উড়তে পারবে।
এছাড়া—
- নির্দিষ্ট স্থানে স্থিরভাবে (Hover) থাকতে হবে।
- প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ মিটার বেগের প্রবল বাতাসেও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।
- জিপিএস বা যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটলেও বিকল্প ব্যবস্থায় কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলি সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কী ধরনের সরঞ্জাম বহন করতে পারবে?
প্রতিটি ড্রোনে সর্বাধিক ২ কিলোগ্রাম পেলোড বহনের ক্ষমতা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এই পেলোডের মধ্যে থাকতে পারে—
- উচ্চ ক্ষমতার ক্যামেরা
- নজরদারি সেন্সর
- ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম
- যোগাযোগ ব্যবস্থা
- অন্যান্য সামরিক পর্যবেক্ষণ যন্ত্র
তবে সরকারি নথিতে নির্দিষ্ট অস্ত্র বহনের বিষয়ে কোনও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
মাত্র ৫ মিনিটে মোতায়েনের লক্ষ্য
এই প্রকল্পে দ্রুত মোতায়েনের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রযুক্তি অনুযায়ী—
- প্যাকিং খোলার ৫ মিনিটের মধ্যে ড্রোন উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
- প্রতিটি ব্যাটারিতে অন্তত ৩০ মিনিট উড়তে হবে।
- দ্রুত চার্জিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অল্প সময়ে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন এমন সামরিক পরিস্থিতিতে এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
দেশীয় শিল্প ও স্টার্টআপদের বড় সুযোগ
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে DRDO-র Technology Development Fund (TDF)-এর অধীনে।
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল—
- দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন
- ভারতীয় স্টার্টআপকে উৎসাহ দেওয়া
- MSME সংস্থাগুলিকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যুক্ত করা
- বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমানো
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধকৌশলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই ড্রোন সোয়ার্ম প্রযুক্তির উপর জোর দিচ্ছে। কারণ একাধিক ছোট ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করলে নজরদারি থেকে শুরু করে লক্ষ্য নির্ধারণ পর্যন্ত বহু কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
ভারতের এই প্রকল্প সফল হলে সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিভিন্ন কৌশলগত অভিযানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটি বর্তমানে উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবে সেনাবাহিনীতে কবে এবং কীভাবে এই প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
শেষ কথা
ড্রোন প্রযুক্তি আজ আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই প্রেক্ষাপটে DRDO-র নতুন সোয়ার্ম প্রকল্প ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত, সমন্বিত এবং জ্যাম-প্রতিরোধী ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে প্রকল্পটি এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে থাকায় এর বাস্তব প্রয়োগ, সময়সীমা এবং পূর্ণ সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সরকারি ঘোষণার দিকেই নজর রাখতে হবে।



