Monday, April 6, 2026
Google search engine
Homeদেশের কথা১৩ বছরের কোমা, শেষমেশ স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি: ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের !

১৩ বছরের কোমা, শেষমেশ স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি: ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের !

Passive Euthanasia India : একজন সন্তানের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা যে কোনও বাবা-মায়ের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা। কিন্তু কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়াকেই শেষ পথ বলে মনে হয়। এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হলো ভারত।

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা ৩২ বছরের এক যুবকের লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার অনুমতি দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত Supreme Court of India। এই সিদ্ধান্তকে ভারতের বিচারব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পাঞ্জাবের যুবক হরিশ রানা। দুর্ঘটনায় গুরুতর মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার পর ২০১৩ সাল থেকে তিনি কার্যত অচেতন অবস্থায় ছিলেন। এত বছর ধরে তিনি না কথা বলতে পারতেন, না কাউকে চিনতে পারতেন।


দুর্ঘটনার পর শুরু হয় দীর্ঘ লড়াই

হরিশ রানা ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তিনি পড়াশোনা করছিলেন Panjab University-এ। পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এক তরুণ।

২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। দুর্ঘটনায় তাঁর মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত লাগে। এরপর থেকেই তিনি গভীর কোমায় চলে যান।

দুর্ঘটনার পর বহু চিকিৎসা করা হলেও তাঁর অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।


বাবা-মায়ের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

১৩ বছর ধরে ছেলের শয্যার পাশে ছিলেন তাঁর বাবা-মা। প্রতিদিন তাঁরা আশায় থাকতেন হয়তো একদিন ছেলে চোখ খুলবে, হয়তো চিনতে পারবে তাদের।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে।

অবশেষে ছেলের অসহ্য যন্ত্রণা আর দীর্ঘ অচেতন অবস্থার কথা ভেবে আদালতের দ্বারস্থ হন হরিশের বাবা-মা। তারা আবেদন করেন যাতে তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

এই আবেদনই পরে ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পরিণত হয়।


চিকিৎসকদের মতামত

মামলাটি শুনানির সময় আদালত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত নেয়। এই জন্য দুটি আলাদা মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়।

দুই বোর্ডই বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একই মত দেয়—হরিশের অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা প্রায় নেই।

তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিমভাবে খাবার ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কোনও বাস্তব উপকার নেই।

এই রিপোর্ট আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।


সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

মামলাটি শুনানি করেন বিচারপতি Justice J. B. Pardiwala এবং Justice K. V. Viswanathan-এর বেঞ্চ।

রায় ঘোষণার সময় বিচারপতিরা হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রশংসা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গত ১৩ বছর ধরে তাঁরা ছেলের পাশে থেকে যে মানসিক শক্তি দেখিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

বেঞ্চ জানায়, চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করাই এখন রোগীর জন্য সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত।

এই কারণেই আদালত লাইফ সাপোর্ট সরানোর অনুমতি দেয়।


ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি অবস্থান

ভারতে সরাসরি সক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যু এখনও সম্পূর্ণভাবে অনুমোদিত নয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে “প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া” বা লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি আদালত দিতে পারে।

এই রায়ের সময় বিচারপতিরা উল্লেখ করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার কথা—Common Cause vs Union of India 2018।

এই মামলায় Supreme Court of India সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার”-কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতিতে যেখানে রোগীর আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।


এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা

এই মামলার সিদ্ধান্ত আইনগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পেছনে রয়েছে এক পরিবারের গভীর যন্ত্রণা।

একজন মেধাবী তরুণ, যিনি একসময় ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনি ১৩ বছর ধরে নিস্তব্ধ জীবনের মধ্যে আটকে ছিলেন।

অন্যদিকে তাঁর বাবা-মা প্রতিদিন সেই দৃশ্য দেখে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত আদালতের এই সিদ্ধান্ত হয়তো তাঁদের কাছে এক কঠিন কিন্তু মানবিক সমাধান হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments