পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন ভারতে জ্বালানি মজুত নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা। পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাস— সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সমস্ত জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক হওয়ার পর থেকেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর সেই আবহেই দেশের হাতে কত দিনের তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনল কেন্দ্র সরকার।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারতের হাতে প্রায় ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ৬০ দিনের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৪৫ দিনের LPG রোলিং স্টকও মজুত আছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি কঠিন হলেও এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো অবস্থা তৈরি হয়নি বলেই সরকারের দাবি। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে চাপ বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আসলে গত কয়েক মাস ধরেই পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করছে। বহু দেশই এখন নিজেদের জ্বালানি সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। ভারত যেহেতু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতে।
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দেশবাসীর উদ্দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষকে অযথা গাড়ি ব্যবহার কমাতে, কারপুল করতে এবং সম্ভব হলে গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দেন। শুধু তাই নয়, রান্নার তেল ব্যবহার কমানো, বিদেশ ভ্রমণে সংযম এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর কথাও বলেন তিনি। মূল লক্ষ্য একটাই— দেশের বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে প্রায় ৭০৩ বিলিয়ন ডলার মজুত রয়েছে। এই রিজার্ভ দেশের অর্থনীতিকে একটি বড় সুরক্ষা দিচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানির খরচও হঠাৎ বেড়ে যায়। সেই চাপ সামলাতেই এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল পরিশোধনকারী দেশ। শুধু দেশের চাহিদা মেটানোই নয়, ভারত বিশ্বের বহু দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিও করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি দেশে ভারত বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য পাঠায়। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য— দুটো সামলাতেই সরকারকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের মতো বিশাল দেশের জন্য ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত তৈরি করে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতিদিন দেশের তেল ব্যবহার প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেলের কাছাকাছি। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিশাল পরিমাণ তেল সংরক্ষণ করতে গেলে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সেই কারণেই সরকার এখন এমন কিছু নীতি নিয়ে ভাবছে, যাতে একদিকে জ্বালানি মজুত বাড়ানো যায়, আবার অন্যদিকে সেই মজুত অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকও হয়।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের স্বস্তির বিষয় হলো, সরকার এখনও পর্যন্ত পেট্রোল ও ডিজেলের দামে বড়সড় বৃদ্ধি হতে দেয়নি। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে বহু দেশে জ্বালানির দাম ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, তবুও ভারতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি প্রতিদিন বিপুল ক্ষতি সহ্য করেও সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই ‘ন্যাশনাল মিশন’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছে, যেখানে জ্বালানি সাশ্রয়, বিকল্প শক্তির ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলিকেও এই উদ্যোগে যুক্ত করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই— ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় দেশকে প্রস্তুত রাখা।
সবমিলিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে ভারতে তেল-গ্যাসের তীব্র সংকট না থাকলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক রয়েছে কেন্দ্র সরকার। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাই সরকার যেমন জ্বালানি মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তেমনই সাধারণ মানুষকেও সচেতনভাবে জ্বালানি ব্যবহার করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখার, বিশ্ব পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং ভারত কতটা সফলভাবে এই চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পারে।



