পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলির মিড ডে মিল প্রকল্পে পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার কিছু স্কুলে আগামী ১ আগস্ট থেকে মধ্যাহ্নভোজের দায়িত্ব ইসকনের হাতে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনার পর থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে, শিক্ষার্থীদের খাবারের মেনু, ডিম থাকবে কি না, এবং দীর্ঘদিন ধরে রান্নার কাজে যুক্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ—এই বিষয়গুলি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সাম্প্রতিক এক সাংবাদিক বৈঠকে ডিম সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আপনারা আরও কয়েকদিন চর্চা করুন, ১ আগস্ট সব জানবেন।” এই মন্তব্যের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে।
কী পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি অঞ্চলের নির্দিষ্ট স্কুলে ইসকনের মাধ্যমে রান্না করা খাবার সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের দাবি, এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত, স্বাস্থ্যসম্মত এবং নির্দিষ্ট পুষ্টিমানের খাবার নিশ্চিত করা।
তবে এই পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে খাবারের তালিকায় কী থাকবে এবং কোন কোন স্কুল এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে, তা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য জানা যায়নি।
ডিম থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার?
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ডিমের বিষয়টি নিয়ে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরেই মিড ডে মিলের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট দিনে ডিম দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।
এখনও পর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি যে ডিম সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হবে। তবে ইসকনের অংশগ্রহণের কারণে নিরামিষ খাবারের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমানে রাজ্যের বহু স্কুলে মধ্যাহ্নভোজ রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। নতুন ব্যবস্থার ফলে তাঁদের কর্মসংস্থানের উপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিষয়টি ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের নজরে এসেছে। আদালত রাজ্য সরকারের কাছে হলফনামা তলব করেছে বলে জানা গিয়েছে। মামলার শুনানির পরই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সরকার কী বলছে?
সরকারের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত মানের খাবার সরবরাহ করাই মূল লক্ষ্য। প্রথম বাজেটে প্রাথমিক স্তরের মিড ডে মিল বাবদ বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ৬ টাকা ৭৮ পয়সা বরাদ্দ ছিল, সেখানে তা বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।
সরকারের দাবি, বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাবারের গুণমান উন্নত করা সম্ভব হবে।
পুষ্টি নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন ও খনিজের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিমকে সহজলভ্য ও উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে ধরা হলেও, নিরামিষ খাদ্য থেকেও ডাল, সয়াবিন, দুধজাত খাবারসহ বিভিন্ন উপায়ে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে পুষ্টিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছেন।
তবে বাস্তবে স্কুলের খাবারের চূড়ান্ত মেনু কী হবে, তার উপরই নির্ভর করবে শিক্ষার্থীরা কতটা পুষ্টি পাবেন।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী প্রতিদিন মিড ডে মিলের উপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এটি শিশুদের দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার।
তাই এই প্রকল্পে যে কোনও পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, তা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং রান্নার কাজে যুক্ত কর্মীদের উপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
আদালত ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর
ইসকনের মাধ্যমে মিড ডে মিল পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশিকা এবং ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের চিত্র।
ততদিন পর্যন্ত ডিম থাকবে কি না, কোন স্কুলে নতুন ব্যবস্থা চালু হবে এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ভূমিকা কী থাকবে—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর সরকারি ঘোষণার মাধ্যমেই মিলবে।



