কালবৈশাখীর ঝড় এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, কিন্তু তার মাঝেই বাংলার মানুষের জন্য এলো বড় সুখবর। তীব্র গরম, আর্দ্রতা আর ঘাম ঝরানো অস্বস্তির মধ্যে এবার আশার আলো দেখাচ্ছে বর্ষা। আবহাওয়া দপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে স্বাভাবিক সময়ের আগেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমন ঘটতে পারে ভারতীয় ভূখণ্ডে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় কালবৈশাখীর দাপট দেখা গেলেও গরমের তেজ কমেনি বললেই চলে। দুপুরের পর থেকেই আকাশে কালো মেঘ জমছে, কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার ফিরছে অস্বস্তিকর আবহাওয়া। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন ছিল— “বর্ষা কবে আসবে?” অবশেষে সেই প্রশ্নের উত্তর দিল আবহাওয়া দপ্তর।
হাওয়া অফিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, এবার নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৫ থেকে ৬ দিন আগেই মৌসুমী বায়ু আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশ করতে পারে। সাধারণত ২২ মে নাগাদ বর্ষা আন্দামান অঞ্চলে ঢোকে। কিন্তু এবারে পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী ১৭ মে-র আশেপাশেই দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগরে মৌসুমী বায়ুর অগ্রগতি শুরু হতে পারে। এর অর্থ, বর্ষার যাত্রা এবার অনেকটাই দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
এই আগাম বর্ষার পিছনে রয়েছে একাধিক আবহাওয়াগত কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব আরব সাগরে ইতিমধ্যেই শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ু তৈরি হয়েছে। এই বায়ু প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প বহন করছে, যা কেরল এবং দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় এলাকাগুলিতে দ্রুত বর্ষা প্রবেশের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ইউরোপীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা ECMWF-এর রিপোর্টেও একই ইঙ্গিত মিলেছে।
সাধারণত ১ জুন কেরলে বর্ষার আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে এবং তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে বর্ষা পৌঁছে যায় পূর্ব ভারত ও পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি বলছে, মে মাসের শেষ সপ্তাহেই কেরলে বর্ষা ঢুকে পড়তে পারে। যদি সেই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে জুনের একেবারে শুরুর দিকেই দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বর্ষার বৃষ্টি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ বহু জেলায় কালবৈশাখীর পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলেও সতর্কতা জারি হয়েছে।
উত্তরবঙ্গেও আবহাওয়ার বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে বিক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন।
তবে এই আগাম বর্ষার খবর যেমন স্বস্তির, তেমনই কিছু উদ্বেগও তৈরি করছে। কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে কৃষিক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনও গ্রীষ্মকালীন ফসল কাটার কাজ চলছে, সেখানে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে জল জমার সমস্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বর্ষার গতিপথ। যদি বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তাহলে এবারের বর্ষা শুধু আগেভাগেই আসবে না, বরং বৃষ্টির পরিমাণও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গরমে নাজেহাল বাংলার মানুষ এবার কিছুটা হলেও স্বস্তির মুখ দেখতে চলেছে। কালবৈশাখীর দাপটের মাঝেই বর্ষার আগমনী বার্তা যেন নতুন আশার সুর শোনাচ্ছে রাজ্যবাসীকে। এখন শুধু অপেক্ষা, কবে প্রথম মৌসুমী বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে দেবে বাংলার মাটি।



