গরম পড়তেই বাড়তে শুরু করেছে বিদ্যুতের ব্যবহার। সারাদিন ফ্যান, এসি, কুলার কিংবা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট চালানোর ফলে মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিল যেন এক বড়সড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের কাছে। অনেকেই ভাবেন, শুধুমাত্র এসি বা ফ্রিজের কারণেই বিল বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু ছোট ছোট ডিভাইস রয়েছে, যেগুলি দিনের পর দিন অজান্তেই বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থাতেও অল্প পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে থাকে। এই বিদ্যুৎ অপচয়কে বলা হয় “স্ট্যান্ডবাই পাওয়ার” বা “ফ্যান্টম পাওয়ার”। অর্থাৎ ডিভাইসটি আপনি ব্যবহার না করলেও, সেটি যদি প্লাগে সংযুক্ত থাকে, তাহলে সেটি বিদ্যুৎ টানতেই থাকে। আর দীর্ঘ সময় ধরে এই ছোট ছোট খরচই মাসের শেষে বড় অঙ্কের বিলে পরিণত হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, একটি সাধারণ পরিবারের মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ শুধুমাত্র এই স্ট্যান্ডবাই পাওয়ারের কারণেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একটু সচেতন হলেই অনেকটা টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
কোন কোন ডিভাইস সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে?
বিশেষজ্ঞদের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে স্মার্ট টিভি। অনেকেই মনে করেন রিমোট দিয়ে টিভি বন্ধ করলেই সেটি সম্পূর্ণ অফ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। স্মার্ট টিভির ভিতরে থাকা সেন্সর, সফটওয়্যার আপডেট এবং ইন্টারনেট কানেকশন সচল রাখার জন্য সেটি ব্যাকগ্রাউন্ডে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেই থাকে। ফলে টিভি বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ খরচ থামে না।
এরপরেই রয়েছে ওয়াই-ফাই রাউটার। অধিকাংশ বাড়িতেই রাউটার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। যদিও ইন্টারনেট ব্যবহার সবসময় হয় না, তবুও রাউটার সারাক্ষণ বিদ্যুৎ টানতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতে বা দীর্ঘ সময় ব্যবহার না হলে রাউটার বন্ধ রাখলে যথেষ্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
কম্পিউটার ও ল্যাপটপও এই তালিকায় রয়েছে। অনেক সময় ব্যবহার শেষে ডিভাইস ‘স্লিপ মোড’-এ রাখা হয়। এতে মনে হয় ডিভাইস বন্ধ রয়েছে, কিন্তু আসলে সেটি কম পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেই থাকে। একইভাবে গেমিং কনসোলও স্ট্যান্ডবাই অবস্থায় বিদ্যুৎ টেনে যায়।
অন্যদিকে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মতো ডিভাইসও চুপিসারে বিদ্যুৎ খরচ করে। ওভেনের ডিজিটাল ডিসপ্লে বা ঘড়ি চালু রাখতেই নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। যদিও পরিমাণে কম, তবে দীর্ঘ সময়ে তা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
মোবাইল চার্জারও বাড়াচ্ছে বিল!
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, মোবাইল চার্জারও বিদ্যুৎ অপচয়ের অন্যতম কারণ। অনেকেই ফোন খুলে নেওয়ার পরও চার্জারটি প্লাগে লাগানো অবস্থায় রেখে দেন। এই সামান্য অসাবধানতাই ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চার্জারে ফোন সংযুক্ত না থাকলেও সেটি অল্প পরিমাণে বিদ্যুৎ টেনে যায়। যদি বাড়িতে একাধিক চার্জার সারাক্ষণ প্লাগ-ইন করা থাকে, তাহলে মাস শেষে সেই খরচ যথেষ্ট বেড়ে যেতে পারে।
কীভাবে কমাবেন বিদ্যুৎ বিল?
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল, ব্যবহার শেষে ডিভাইসের মেইন সুইচ বন্ধ করা। শুধু রিমোট দিয়ে টিভি বা অন্যান্য গ্যাজেট অফ করলেই হবে না, সম্ভব হলে সরাসরি প্লাগ খুলে রাখা উচিত।
এছাড়াও সুইচ-যুক্ত মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে একসঙ্গে একাধিক ডিভাইসের সংযোগ একটি ক্লিকেই বন্ধ করা সম্ভব হয়। ফলে স্ট্যান্ডবাই পাওয়ারের অপচয় অনেকটাই কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, নতুন ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার সময় অবশ্যই ‘এনার্জি স্টার’ রেটিং দেখে নেওয়া উচিত। এই ধরনের ডিভাইস তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘমেয়াদে খরচ বাঁচাতে সাহায্য করে।
এছাড়া পুরনো ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎখেকো যন্ত্রপাতি বদলে আধুনিক এনার্জি-সেভিং ডিভাইস ব্যবহার করলেও অনেকটা সাশ্রয় সম্ভব। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ছোট ছোট অভ্যাস বড় ভূমিকা নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, একটু সচেতনতা এবং কয়েকটি সহজ অভ্যাস বদলালেই বিদ্যুৎ বিল অনেকটাই কমানো সম্ভব। কারণ অনেক সময় বড় খরচের পিছনে দায়ী থাকে ঘরের ছোট্ট কিছু ডিভাইসই।



