বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নিজের ব্যবসা শুরু করার আগ্রহও। বিশেষ করে এমন ব্যবসা, যেখানে একদিকে যেমন স্থায়ী আয়ের সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে সমাজের উপকারও করা যায়—সেই ধরনের উদ্যোগের প্রতিই এখন বেশি ঝুঁকছে যুবসমাজ। আর ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে কেন্দ্র সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনৌষধি পরিযোজনা’ বা PMBJP প্রকল্প।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল দেশের সাধারণ মানুষের কাছে কম খরচে উন্নত মানের ওষুধ পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে নতুন ব্যবসার সুযোগ। কেন্দ্র সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বেশি সংখ্যক জনঔষধি কেন্দ্র খোলা হলে সাধারণ মানুষ অনেক কম দামে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাবেন। আর সেই সঙ্গে বহু যুবক-যুবতী নিজেদের ব্যবসা শুরু করে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কী এই প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি পরিযোজনা?
সাধারণত বাজারে আমরা যে ওষুধগুলি কিনে থাকি, সেগুলির অধিকাংশই বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের অধীনে বিক্রি হয়। কিন্তু একই কার্যকারিতা ও একই উপাদান থাকা সত্ত্বেও সেই ওষুধের দাম অনেক সময় অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়। কারণ ব্র্যান্ডিং, বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিংয়ের পিছনে বিপুল টাকা খরচ হয়। আর এই কারণেই সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচও বাড়তে থাকে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই কেন্দ্র সরকার চালু করেছে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি প্রকল্প। এখানে ব্র্যান্ডেড ওষুধের পরিবর্তে জেনেরিক ওষুধ বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ, একই মানের ও একই উপাদানের ওষুধ অনেক কম দামে পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাজারের তুলনায় ৫০% থেকে ৯০% পর্যন্ত কম খরচে ওষুধ পাওয়া সম্ভব।
কেন এই ব্যবসা এত জনপ্রিয় হচ্ছে?
বর্তমানে দেশের বহু তরুণ এই ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। কারণ এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সারা বছরই চাহিদা থাকে। পোশাক, ইলেকট্রনিক্স বা অন্যান্য ব্যবসার মতো এখানে মৌসুমি ওঠানামা খুব একটা নেই। মানুষের অসুস্থতা বা চিকিৎসার প্রয়োজন তো কখনও বন্ধ হয় না। ফলে ওষুধের ব্যবসায় স্থায়ী ক্রেতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
তার পাশাপাশি সরকার উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক ইনসেনটিভও দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ব্যবসা শুরু করার পর আর্থিক সহায়তাও পাওয়া যায়। ফলে নতুন ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
এই প্রকল্পে আবেদন করার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়। সাধারণ ভারতীয় নাগরিক, রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট, ডাক্তার, ট্রাস্ট, NGO বা স্বনির্ভর গোষ্ঠী—সবাই আবেদন করতে পারেন। তবে ওষুধ বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় ড্রাগ লাইসেন্স এবং দোকানের জায়গা থাকা বাধ্যতামূলক।
অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র বড় ব্যবসায়ীরাই এই ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে কম পুঁজি নিয়েও এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। বিশেষ করে ছোট শহর বা গ্রামীণ এলাকায় এই ধরনের কেন্দ্রের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
কীভাবে আবেদন করবেন?
আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে করা যায়। আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি পরিযোজনার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করতে হয়। সাধারণত আধার কার্ড, PAN কার্ড, ফার্মাসিস্ট রেজিস্ট্রেশন, দোকানের ঠিকানা এবং ড্রাগ লাইসেন্সের মতো নথি প্রয়োজন হয়।
সমস্ত তথ্য যাচাই হওয়ার পর আবেদন অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনঔষধি কেন্দ্র খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর সরকার নির্দিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ শুরু করে।
কতটা লাভ হতে পারে?
এই ব্যবসায় লাভের অন্যতম বড় কারণ হল নির্দিষ্ট প্রফিট মার্জিন। প্রতিটি ওষুধ বিক্রির উপর উদ্যোক্তারা কমিশন পান। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ বিক্রি হলে অতিরিক্ত ইনসেনটিভও দেওয়া হয়। ফলে অনেকেই কয়েক বছরের মধ্যেই এই ব্যবসা থেকে স্থায়ী আয়ের রাস্তা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এটি শুধুমাত্র ব্যবসা নয়, সমাজসেবারও একটি বড় মাধ্যম। কারণ কম দামে ওষুধ পাওয়ার ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমাতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত উপকারী।
কেন এই প্রকল্প ভবিষ্যতের বড় সুযোগ?
ভারতে স্বাস্থ্য পরিষেবার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে জেনেরিক ওষুধের বাজার আরও বড় হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষও এখন ধীরে ধীরে কম দামে মানসম্মত ওষুধের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছেন। ফলে এই ক্ষেত্রের ব্যবসার সম্ভাবনাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তাই যারা স্বল্প বিনিয়োগে একটি দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ ও সমাজমুখী ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি প্রকল্প হতে পারে দুর্দান্ত সুযোগ। একদিকে যেমন নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা যাবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও মিলবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারি সহায়তা, স্থায়ী চাহিদা, কম ঝুঁকি এবং সমাজসেবার সুযোগ—এই চারটি বিষয়ই এই প্রকল্পকে আজকের যুবসমাজের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।



