মহিলা বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। আর সেই বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচে দাপট দেখিয়ে দুর্দান্ত জয় তুলে নিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। ব্যাট হাতে স্মৃতি মন্ধানা ও রিচা ঘোষের ঝলক, আর বল হাতে দীপ্তি শর্মা ও শ্রী চরণীর ঘূর্ণিতে পাকিস্তানকে ৬৪ রানে হারিয়ে টুর্নামেন্টে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করল হরমনপ্রীত কৌরের দল।
বার্মিংহামের মাঠে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর। শুরুটা অবশ্য ভারতের পক্ষে খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। ওপেনার শেফালি বর্মা প্রথম বলেই ছক্কা মেরে আগ্রাসী বার্তা দিলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। পাকিস্তানের তারকা স্পিনার সাদিয়া ইকবালের বলে দ্রুত সাজঘরে ফেরেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে যান জেমাইমা রডরিগেজও।
দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যাওয়া ভারতকে তখন সামাল দেন সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মন্ধানা এবং অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর। শুরুতে উইকেটের আচরণ বুঝে নিয়ে দু’জনে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়তে থাকেন। সিঙ্গেল-ডাবলসের মাধ্যমে স্কোরবোর্ড সচল রাখার পাশাপাশি খারাপ বল পেলেই বাউন্ডারি আদায় করে নেন তাঁরা।
প্রথম ১০ ওভারে ভারত পৌঁছে যায় ৬৫ রানে। এরপরই গিয়ার বদল করেন দুই ব্যাটার। বিশেষ করে স্মৃতি মন্ধানা নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক মেজাজে ফিরে আসেন। পাকিস্তানি বোলারদের বিরুদ্ধে একের পর এক আকর্ষণীয় শট খেলতে শুরু করেন তিনি। মাত্র ৩৪ বলে ব্যক্তিগত অর্ধশতরান পূর্ণ করেন ভারতের এই বাঁহাতি ওপেনার।
স্মৃতি ও হরমনপ্রীতের মধ্যে গড়ে ওঠে ৯১ রানের মূল্যবান জুটি। এই জুটিই ভারতের বড় স্কোরের ভিত তৈরি করে দেয়। তবে পাকিস্তানের অধিনায়ক ফাতিমা সানা মাঝপথে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। রামিন শামিমের বলে লং-অন অঞ্চলে স্মৃতির অসাধারণ ক্যাচ ধরেন তিনি। ৪৪ বলে ৬৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ফেরেন স্মৃতি।
এরপর ভারতী ফুলমালিকে চার নম্বরে পাঠানোর কৌশল সফল হয়নি। তিনি মাত্র ১ রান করে আউট হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ৩৬ রান করা হরমনপ্রীতও সাজঘরে ফিরে গেলে ভারতের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়।
তবে শেষ ওভারে ম্যাচের রং পুরোপুরি বদলে দেন বাংলার তারকা উইকেটরক্ষক-ব্যাটার রিচা ঘোষ। ক্রিজে নেমেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করেন তিনি। প্রথম বলেই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দেন। মাত্র ১৭ বলে ৩৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন রিচা। তাঁর ব্যাট থেকেই আসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চার ও ছক্কা। বিশেষ করে ১৯তম ওভারে ভারত তোলে ২৩ রান, যা পাকিস্তানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে দেয়।
নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ভারত সংগ্রহ করে ১৭০ রান। পাকিস্তানের বোলারদের মধ্যে ফাতিমা সানা সবচেয়ে সফল ছিলেন।
১৭১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান শুরুটা খারাপ করেনি। ওপেনার মুনিবা আলি এবং গুল ফিরোজা সাবধানী ব্যাটিং করে দলকে ভালো সূচনা এনে দেন। মনে হচ্ছিল ম্যাচে লড়াই জমে উঠতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনা দ্রুত শেষ করে দেন ভারতের অভিজ্ঞ স্পিনার দীপ্তি শর্মা। গুল ফিরোজাকে ফিরিয়ে প্রথম ধাক্কা দেন তিনি। এরপর একে একে পাকিস্তানের মিডল অর্ডার ভেঙে পড়তে শুরু করে। আয়েশা জাফর, সায়রা জাবিন, নাটালিয়া পারভেজ এবং অধিনায়ক ফাতিমা সানা কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
একপ্রান্তে মুনিবা আলি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর রান আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় পাকিস্তান। এরপর আর কোনো ব্যাটার ভারতীয় বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে পারেননি।
এই ম্যাচে ভারতের তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় দ্বিতীয় ইনিংসে। দীপ্তি শর্মা, শ্রী চরণী এবং শ্রেয়াঙ্কা পাতিল পাকিস্তানের ব্যাটারদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করেন। পাকিস্তান দীর্ঘ সময় বাউন্ডারি খুঁজে পায়নি। ফলে রানরেট বাড়তে থাকে এবং উইকেটও পড়তে থাকে নিয়মিত ব্যবধানে।
বল হাতে ম্যাচের সেরা পারফরম্যান্স আসে দীপ্তি শর্মার কাছ থেকে। মাত্র ১০ রান খরচ করে তিনি তুলে নেন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। অন্যদিকে শ্রী চরণী ২১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে আরও চাপে ফেলে দেন। শেফালি বর্মাও একটি উইকেট তুলে নেন।
শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০৬ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। ফলে ৬৪ রানের বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ভারতীয় মহিলা দল।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এমন আত্মবিশ্বাসী জয় নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য বড় ইতিবাচক দিক। ব্যাট হাতে স্মৃতি মন্ধানার পরিণত ইনিংস, রিচা ঘোষের বিধ্বংসী ফিনিশিং এবং বল হাতে দীপ্তি শর্মার অসাধারণ স্পেল দলকে আত্মবিশ্বাসের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
এখন ভারতীয় সমর্থকদের নজর আগামী ম্যাচের দিকে। বিশ্বকাপে ভারতের পরবর্তী ম্যাচ ১৭ জুন নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে। প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে টুর্নামেন্টে ভারত যে অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে উঠে আসবে, তা বলাই যায়।



