পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘিরে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাজেট বক্তৃতা পেশ করেন। এই বাজেটে সরকারি কর্মচারী, যুবক-যুবতী, কৃষক, মহিলা, ছাত্রছাত্রী, প্রবীণ নাগরিক এবং শিল্পক্ষেত্র—প্রায় সব স্তরের মানুষের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজ্যের অর্থনীতি চাঙ্গা করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নতুন জেলা, মহকুমা এবং বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
১. সরকারি কর্মীদের জন্য বড় সুখবর, ডিএ বৃদ্ধি
বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা হল মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ বৃদ্ধি। বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ১৮ শতাংশ ডিএ পান। নতুন ঘোষণার ফলে তা বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছবে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই নতুন হার কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
২. তৈরি হচ্ছে ৫টি নতুন জেলা
প্রশাসনিক পরিষেবা আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন জেলা হিসেবে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগের নাম সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি নতুন মহকুমা, পুলিশ জেলা এবং একাধিক পুরসভা গঠনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। গোপীবল্লভপুরে নতুন মহকুমা এবং কাঁথিতে নতুন পুলিশ জেলা তৈরির কথাও জানানো হয়েছে।
৩. এক লক্ষ সরকারি চাকরির ঘোষণা
রাজ্যের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ১ লক্ষ শূন্যপদ পূরণের ঘোষণা করা হয়েছে।
এই নিয়োগের মধ্যে রয়েছে—
- ২০ হাজার পুলিশ কর্মী
- ৫০ হাজার শিক্ষক, অধ্যাপক ও শিক্ষা কর্মী
- ১ হাজার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রন্টিয়ার ও রাইফেলস কর্মী
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মোট শূন্যপদের ৩০ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
৪. বিভিন্ন ভাতা ও পেনশনে বৃদ্ধি
বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী—
- বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি
- বিধবা ভাতা বৃদ্ধি
- বিশেষভাবে সক্ষমদের পেনশন বৃদ্ধি
এছাড়াও সিভিক ভলান্টিয়ার, আশা কর্মী, ভিলেজ পুলিশ, গ্রিন পুলিশ, হোমগার্ড এবং মিড-ডে মিল কর্মীদের ভাতাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৫. বেকার যুবকদের জন্য ‘ভরসা’ কর্মসূচি
রাজ্যের ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষিত ও কর্মহীন যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন ‘ভরসা’ প্রকল্প চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পে—
- স্নাতক বেকারদের মাসিক ৩,০০০ টাকা
- অন্যান্য যোগ্য আবেদনকারীদের মাসিক ২,০০০ টাকা
আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
৬. মহিলাদের জন্য একাধিক বিশেষ সুবিধা
মহিলা কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিতে বড়সড় বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলি হল—
- অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা
- বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য ৫৫০ কোটি টাকা
- নতুন পিঙ্ক কার্ড ব্যবস্থা
- গর্ভবতী মহিলাদের ২১ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা
- ৬টি পুষ্টি কিট
- উচ্চশিক্ষায় অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা
৭. শিক্ষাক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ
রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- আদর্শ বিদ্যালয় তৈরির জন্য ২১০০ কোটি টাকা
- শিলিগুড়িতে IIT ও IIM প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
- সংস্কৃত শিক্ষা প্রসারে ৫০ কোটি টাকা
- ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় নতুন কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়
- প্রতিটি জেলায় বিনামূল্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং সেন্টার
এছাড়া মিড-ডে মিলের বরাদ্দও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৮. স্বাস্থ্য পরিষেবায় নতুন পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে।
বাজেট অনুযায়ী—
- উত্তরবঙ্গে AIIMS ও ক্যান্সার হাসপাতাল
- ৫টি নতুন মেডিক্যাল হাব
- ভেলোর ও মুম্বইয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর পরিবারের থাকার ব্যবস্থা
- সুন্দরবনে মোটরবোট অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা
এই প্রকল্পগুলি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
৯. শিল্প ও বিনিয়োগে জোর
রাজ্যে নতুন শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে বেশ কিছু প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ব্যাটারি চালিত গাড়ির কারখানা
- শিলিগুড়িতে ইন্টিগ্রেটেড লজিস্টিক হাব
- আইটি পার্ক
- দুর্গাপুরে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট
- দক্ষিণ দিনাজপুরে টেক্সটাইল হাব
এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১০. পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ
ধর্মীয় পর্যটনকে উৎসাহ দিতে নতুন শক্তিপীঠ সার্কিট তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই সার্কিটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে—
- কালীঘাট
- তারাপীঠ
- ফুল্লরা
- বক্রেশ্বর
এছাড়াও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য হেরিটেজ কমিশন গঠন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি সংরক্ষণের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
উপসংহার
রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং সামাজিক সুরক্ষার উপর সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ডিএ বৃদ্ধি, এক লক্ষ চাকরি, নতুন জেলা, যুব ভাতা এবং শিল্প বিনিয়োগের মতো ঘোষণাগুলি আগামী দিনে রাজ্যের অর্থনীতি ও প্রশাসনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের।



