পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে দাবি করছে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ। দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্দরে চলা মতবিরোধ ও ক্ষোভ এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল নেতা-বিধায়ক ও জনপ্রতিনিধি পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করে নতুন কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটির পক্ষ থেকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে আয়োজিত বৈঠকে উপস্থিত নেতারা দাবি করেন, দলের ভবিষ্যৎ ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের স্বার্থে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। সেই বৈঠক থেকেই নতুন তৃণমূল কমিটির ঘোষণা করা হয়। বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, সেখানে দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের কোনও ছবি ব্যবহার করা হয়নি। বরং জাতীয় ও সামাজিক চিন্তার বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ছবি মঞ্চে স্থান পেয়েছে। যদিও দলীয় প্রতীক হিসেবে জোড়াফুলকেই ব্যবহার করা হয়েছে।
বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও হাওড়া মধ্য কেন্দ্রের বিধায়ক অরূপ রায়কে নতুন কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস এবং রথীন ঘোষকে ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে, পাশাপাশি জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং সাবিনা ইয়াসমিনকেও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আখরুজ্জামান।
নতুন কমিটির ঘোষণার পাশাপাশি আরও একটি বড় সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দলের শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক নীতির প্রশ্নে কিছু শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যদিও এই সিদ্ধান্তের কোনও সাংবিধানিক বা আইনি বৈধতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী ফলাফল, সাংগঠনিক অসন্তোষ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, এই বৈঠক তারই বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে চলা মতপার্থক্য এবার প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। বীরভূম, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা সেখানে অংশ নেন। এছাড়াও কয়েকটি পুরসভার কাউন্সিলর এবং স্থানীয় স্তরের সংগঠকরা নতুন কমিটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত সাংগঠনিক নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে? কারণ নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃত দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই রয়েছে। ফলে বিদ্রোহী শিবিরের এই নতুন কমিটি কতটা সাংগঠনিক স্বীকৃতি পাবে, তা সময়ই বলবে।
এখন নজর রয়েছে দলীয় প্রতীককে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের দিকে। যদি দুই পক্ষই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করে, তাহলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়াতে পারে। দেশের রাজনীতিতে এর আগেও একাধিক আঞ্চলিক ও জাতীয় দলে এমন বিভাজনের ঘটনা দেখা গিয়েছে, যেখানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে কালীঘাট শিবির এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন কমিটির দাবির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, খুব শীঘ্রই এই ইস্যুতে পাল্টা সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই সংঘাত কেবল নেতৃত্বের লড়াই নয়, বরং দলীয় অস্তিত্ব, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণের উপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী কয়েকদিনে দুই পক্ষের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয় এবং শেষ পর্যন্ত দলের প্রতীক ও সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকে।



