রাজ্যের অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবায় ডিজিটাল কাজের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যেই কয়েক বছর আগে কর্মীদের স্মার্টফোন কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থ ব্যবহার করে সরকারি অ্যাপের মাধ্যমে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য আপলোড, পুষ্টি কর্মসূচির অগ্রগতি নথিভুক্ত করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও একাংশ কর্মী নির্ধারিত উদ্দেশ্যে সেই অর্থ ব্যবহার করেননি বলে অভিযোগ। এরপরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তরফে কড়া পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, যাঁরা স্মার্টফোন কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা পেলেও ফোন কেনেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্টও তলব করা হয়েছে।
কেন দেওয়া হয়েছিল স্মার্টফোন কেনার টাকা?
অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। শিশুদের পুষ্টির তথ্য, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য, টিকাকরণ, উপস্থিতি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি এখন মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হয়।
এই উদ্দেশ্যেই এক লক্ষেরও বেশি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে স্মার্টফোন কেনার জন্য ১০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থ শুধুমাত্র স্মার্টফোন কেনার জন্য ব্যবহার করার নির্দেশ ছিল বলেই প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কতজন কর্মীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে?
প্রাথমিক প্রশাসনিক পর্যালোচনায় জানা গিয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন কেনেননি বলে তথ্য সামনে এসেছে। সংখ্যার বিচারে এই সংখ্যা ১৩ হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে চূড়ান্ত সংখ্যা জেলা ভিত্তিক রিপোর্ট জমা পড়ার পরই স্পষ্ট হবে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কী নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর?
নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের অধীন আইসিডিএস (ICDS) প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন জেলায় নির্দেশ পাঠানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই নির্দেশিকায় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
- যাঁরা বরাদ্দ অর্থ পেয়েও স্মার্টফোন কেনেননি, তাঁদের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।
- বরাদ্দ অর্থ এখনও অব্যবহৃত থাকলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- কেন নির্ধারিত উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যবহার করা হয়নি, তার লিখিত ব্যাখ্যা সংগ্রহ করতে হবে।
- জেলা প্রশাসনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
প্রশাসনের দাবি, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কেন স্মার্টফোন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার বড় অংশই ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ‘পোশন’ সংক্রান্ত অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিনের বিভিন্ন তথ্য আপলোড করতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—
- শিশুদের ওজন ও উচ্চতার তথ্য
- অপুষ্টির পর্যবেক্ষণ
- গর্ভবতী মহিলাদের তথ্য
- প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নথি
- খাদ্য বিতরণের রেকর্ড
- সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি
এই সমস্ত তথ্য রিয়েল-টাইমে আপলোড করা সম্ভব হলে প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারে। ফলে স্মার্টফোন না থাকলে পুরো ব্যবস্থাই প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারি অর্থের ব্যবহারে বাড়ছে নজরদারি
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার হয়েছে। সরকারি অনুদান নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে বিভিন্ন স্তরে অডিট ও তথ্য সংগ্রহ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি প্রকল্পের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর।
টাকা ফেরত না দিলে কী হতে পারে?
সরকারি নির্দেশিকায় কী ধরনের পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে সরকারি সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছ থেকে প্রথমে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
যদি দেখা যায় বরাদ্দ অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি এবং সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্র পৃথকভাবে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে প্রশাসনিক মহলের ইঙ্গিত।
অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার উপর এর প্রভাব কী?
অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাঁদের মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহুরে এলাকার লক্ষ লক্ষ পরিবার সরকারি পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়ায় তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও প্রশাসনের পক্ষে অনেক সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।
তাই স্মার্টফোনের মতো মৌলিক ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ কর্মীদের কী করা উচিত?
যাঁরা বরাদ্দ অর্থ পেয়েছেন, তাঁদের সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী সমস্ত নথি সংরক্ষণ করা উচিত। যদি ইতিমধ্যেই স্মার্টফোন কেনা হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণপত্র প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইসিডিএস প্রকল্প বা জেলা প্রশাসনের নির্দেশ মেনে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও নথিপত্র জমা দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী হতে পারে?
এখন নজর থাকবে জেলা প্রশাসনের রিপোর্টের দিকে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই কতজন কর্মীর বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কত টাকা ফেরত আসতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নতুন কোনও নির্দেশিকা জারি করা হবে কি না, তা স্পষ্ট হবে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্রশাসনকে আরও কার্যকর করে তোলাই এই পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য। ফলে চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করার পরামর্শই দিচ্ছে প্রশাসনিক মহল।



