এক সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে পাসবই আপডেট বা ব্যালেন্স চেক করতে গিয়েই চমকে উঠলেন বহু গ্রাহক। যাঁদের অ্যাকাউন্টে সাধারণত কয়েকশো বা কয়েক হাজার টাকা থাকে, তাঁদের অনেকের ব্যালেন্সে দেখা গেল প্রায় ৭৫৯ কোটি ৬৯ লক্ষ ৫১ হাজার ৯৫১ টাকা। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায়। কেউ ব্যাঙ্কে ছুটলেন, কেউ আবার থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালেন।
প্রাথমিকভাবে ব্যাঙ্কের তরফে প্রযুক্তিগত ত্রুটির ইঙ্গিত দেওয়া হলেও, বিষয়টি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আদৌ কি এই টাকা সত্যিই জমা পড়েছিল, নাকি এটি শুধুই সফটওয়্যারের সমস্যা? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই উত্তর স্পষ্ট নয়।
কোথায় কোথায় দেখা গেল এই অস্বাভাবিক ব্যালেন্স?
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, ময়নাগুড়ি-সহ রাজ্যের একাধিক এলাকার কিছু গ্রাহক তাঁদের অ্যাকাউন্টে একই ধরনের অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখতে পান।
অনেকেই সরকারি প্রকল্পের টাকা, বৃত্তি বা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন। সেখানেই ব্যালেন্সে শতকোটি টাকার বেশি অঙ্ক দেখে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়।
ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ কী জানিয়েছে?
ব্যাঙ্ক সূত্রে প্রাথমিকভাবে দাবি করা হয়েছে, এটি কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (CBS)-এর একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টে বিপুল অঙ্কের টাকা দেখা গেলেও তা বাস্তবে ব্যবহার বা উত্তোলন করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, ব্যালেন্সে যে সংখ্যা দেখা গিয়েছে, সেটি প্রকৃত অর্থে জমাকৃত অর্থ নয় বলেই ব্যাঙ্কের প্রাথমিক ব্যাখ্যা।
এছাড়াও জানা গিয়েছে, তুলনামূলকভাবে কম লেনদেন হয় এমন কিছু অ্যাকাউন্টে এই সমস্যা বেশি দেখা গিয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কোর ব্যাংকিং সিস্টেম কী?
কোর ব্যাংকিং সিস্টেম বা CBS হল এমন একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শাখার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়।
কখনও কখনও সফটওয়্যার আপডেট, ডেটা সিঙ্ক্রোনাইজেশন বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে অ্যাকাউন্টে ভুল ব্যালেন্স বা লেনদেনের তথ্য সাময়িকভাবে দেখা যেতে পারে। যদিও এমন ঘটনা খুবই বিরল এবং সাধারণত দ্রুত সংশোধন করা হয়।
তদন্তে কী কী বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে?
ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ব্যাঙ্ক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি বিষয়টি পরীক্ষা করছে।
প্রাথমিকভাবে যে বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—
- প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ব্যালেন্স প্রদর্শনে সমস্যা হয়েছে কি না।
- নির্দিষ্ট কয়েকটি অ্যাকাউন্ট নাকি বৃহত্তর পরিসরে এই সমস্যা হয়েছে।
- কোনও সাইবার নিরাপত্তাজনিত সমস্যা রয়েছে কি না, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে।
তবে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি সংস্থা এই ঘটনাকে সাইবার জালিয়াতি বলে নিশ্চিত করেনি।
গ্রাহকদের কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি।
- ব্যাঙ্কে গিয়ে অ্যাকাউন্টের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করুন।
- সন্দেহজনক ব্যালেন্স দেখে কোনও লেনদেনের চেষ্টা করবেন না।
- অচেনা ফোন, লিঙ্ক বা OTP সংক্রান্ত অনুরোধ এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজনে ব্যাঙ্কের গ্রাহক পরিষেবা বা নিকটবর্তী শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- প্রয়োজন মনে করলে স্থানীয় থানায় বা সাইবার ক্রাইম সেলে বিষয়টি জানাতে পারেন।
প্রযুক্তিগত ত্রুটি নাকি অন্য কিছু?
বর্তমানে এই ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। ব্যাঙ্কের প্রাথমিক ব্যাখ্যায় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা বলা হলেও, পুরো বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে কেন এত সংখ্যক গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে একই ধরনের বিপুল অঙ্কের ব্যালেন্স দেখা গিয়েছিল এবং এর পিছনে প্রকৃত কারণ কী।
আপাতত গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
যদি আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও হঠাৎ অস্বাভাবিক বা অবিশ্বাস্য পরিমাণ টাকা দেখা যায়, তাহলে সেটিকে নিজের অর্থ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রথমেই ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই করুন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস না করে শুধুমাত্র ব্যাঙ্ক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্যের উপর নির্ভর করাই সবচেয়ে নিরাপদ।



