শপিং মল, বহুতল আবাসন, অফিস কিংবা হাসপাতাল—আজকের শহুরে জীবনে লিফট ছাড়া চলাই কঠিন। কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে মাঝপথে লিফট থেমে গেলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বদ্ধ জায়গায় আটকে থাকার ভয় থেকে কারও কারও শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা প্যানিক অ্যাটাকও শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থেমে যাওয়া লিফট প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করে না। বরং আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াই বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন এবং কী করবেন না—তা আগে থেকেই জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিফট হঠাৎ থেমে গেলে প্রথমেই কী করবেন?
লিফট থেমে যাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা। কয়েক মুহূর্ত গভীর শ্বাস নিয়ে পরিস্থিতি বুঝুন। মনে রাখবেন, আধুনিক লিফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয় যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মাঝপথে পড়ে যায় না।
আতঙ্কে চিৎকার করা বা হুড়োহুড়ি করার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সাহায্য চাওয়ার পদক্ষেপ নিন।
জরুরি অ্যালার্ম বা বেল ব্যবহার করুন
প্রায় সব আধুনিক লিফটেই জরুরি অ্যালার্ম বা বেল বাটন থাকে। সেটি কয়েক সেকেন্ড চেপে ধরে রাখুন, যাতে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা রক্ষণাবেক্ষণকারী বিষয়টি জানতে পারেন।
অনেক লিফটে অ্যালার্মের পাশাপাশি জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও থাকে।
ইন্টারকম থাকলে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করুন
যদি লিফটের ভিতরে ইন্টারকম থাকে, তাহলে নিরাপত্তাকর্মী, কেয়ারটেকার বা কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
শান্তভাবে নিজের অবস্থান জানিয়ে সাহায্য চাইুন। এতে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকলে ফোন করুন
যদি মোবাইলে নেটওয়ার্ক থাকে, তাহলে পরিবারের সদস্য, ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা সংশ্লিষ্ট জরুরি নম্বরে ফোন করুন।
কথা বলার সময় জানিয়ে দিন—
- কোন ভবনে রয়েছেন
- সম্ভব হলে কত নম্বর তলায় লিফট আটকে আছে
- লিফটের ভিতরে কতজন রয়েছেন
- কারও শারীরিক অসুস্থতা আছে কি না
আলো নিভে গেলে কী করবেন?
বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় লিফটের ভিতরে অন্ধকার হয়ে যেতে পারে।
সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে মোবাইলের টর্চ ব্যবহার করুন। তবে অযথা ফোন ব্যবহার করবেন না। ব্যাটারি সংরক্ষণ করা জরুরি, কারণ দীর্ঘ সময় যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে।
ভুলেও দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করবেন না
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
লিফট আটকে গেলে অনেকেই দরজা ঠেলে বা ফাঁক করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
লিফট হঠাৎ চলতে শুরু করলে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কর্মী না আসা পর্যন্ত কখনও নিজে থেকে বেরোনোর চেষ্টা করবেন না।
লাফালাফি বা ধাক্কাধাক্কি করবেন না
আতঙ্কে কেউ কেউ লিফট নাড়ানোর জন্য লাফাতে থাকেন বা দেয়ালে ধাক্কা দেন।
এতে কোনও উপকার হয় না, বরং যান্ত্রিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকাই নিরাপদ।
প্যানিক অ্যাটাক হলে কী করবেন?
অনেকেরই বদ্ধ জায়গায় থাকলে ক্লস্ট্রোফোবিয়া বা প্যানিক অ্যাটাকের সমস্যা দেখা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন।
সহজ একটি পদ্ধতি হলো বক্স ব্রিদিং—
- ধীরে শ্বাস নিন।
- কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন।
- ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন।
- আবার কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন।
এই প্রক্রিয়া কয়েকবার করলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
লিফটের ভিতরে কি অক্সিজেন ফুরিয়ে যায়?
এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা।
আধুনিক লিফটে সাধারণত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। ভেন্টিলেশন থাকায় ভিতরের বাতাস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না।
তাই দম বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ভয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়।
শিশু বা বয়স্ক কেউ সঙ্গে থাকলে কী করবেন?
যদি লিফটে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা অসুস্থ কেউ থাকেন, তাহলে তাঁদের আগে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন।
অযথা ভয়ের কথা না বলে জানান যে সাহায্য আসছে এবং সবাই নিরাপদ আছেন।
এতে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকতে কী মনে রাখবেন?
লিফট ব্যবহারের সময় কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে—
- অতিরিক্ত ওজন নিয়ে লিফটে উঠবেন না।
- দরজা জোর করে আটকে রাখবেন না।
- শিশুদের একা লিফটে পাঠানো এড়িয়ে চলুন।
- জরুরি অ্যালার্ম কোথায় আছে, আগে থেকেই দেখে রাখুন।
- কোনও অস্বাভাবিক শব্দ বা ঝাঁকুনি অনুভব করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।
মনে রাখবেন
লিফট মাঝপথে থেমে যাওয়া অবশ্যই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রাণঘাতী নয়। আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে শান্ত থাকা, জরুরি সাহায্য চাওয়া এবং নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সচেতনতা থাকলে লিফটে আটকে পড়ার মতো পরিস্থিতিতেও বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তাই পরিবারের সকল সদস্য, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদেরও এই নিরাপত্তা নিয়মগুলি আগে থেকেই জানিয়ে রাখা উচিত।



