বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্বাসিত লেখকদের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘদিন ধরে নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করলেও এবার তিনি এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের দেশে ফেরার সুযোগ থাকা উচিত।
শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নয়, বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তসলিমা। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
কেন নতুন করে আলোচনায় তসলিমা নাসরিন?
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশ ছাড়ার পর বিভিন্ন দেশে বসবাস করলেও তাঁর জন্মভূমিতে ফেরা এখনও সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি কলকাতায় এসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের মত প্রকাশের সময় তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন।
সেখানেই তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিরোধিতা কোনও ব্যক্তির নিজের দেশে ফেরার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে কী বললেন?
তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চান শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসুন।
তিনি বলেন, তাঁকে নিজেকেও দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়েও তাঁর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মত, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একজন নাগরিক বা রাজনৈতিক নেতার নিজের দেশে থাকার অধিকার থাকা উচিত।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং নীতিগত অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নিয়ে কী মন্তব্য করলেন লেখিকা?
শুধু শেখ হাসিনার প্রসঙ্গেই নয়, আওয়ামী লীগ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তসলিমা নাসরিন।
তাঁর মতে, কোনও গণতান্ত্রিক দেশে বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া আদর্শ সমাধান হতে পারে না। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে বলেই তিনি মনে করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াই রাজনৈতিক পরিসরেই হওয়া উচিত, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।
শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনাও করেছেন
যদিও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন, তবুও তাঁর সরকারের একাধিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছেন তসলিমা নাসরিন।
বিশেষ করে শিক্ষা ও ধর্মীয় নীতির কিছু বিষয় নিয়ে তিনি অতীতেও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রের নীতি এমন হওয়া উচিত যেখানে মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে মত দিলেও তাঁর সরকারের সব সিদ্ধান্তকে তিনি সমর্থন করছেন—এমন নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তসলিমা নাসরিন।
তাঁর দাবি, ভিন্নমত পোষণকারী অনেক মানুষ বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। অনেক লেখক, গবেষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মতভেদ থাকলেও নাগরিকেরা নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রসঙ্গেও সরব
বাংলাদেশে কারাবন্দি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তসলিমা নাসরিন।
তিনি অভিযোগ করেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে অকারণে দীর্ঘদিন ধরে আটক রাখা হয়েছে। এই ঘটনায় তিনি একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন।
যদিও এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান আলাদা হতে পারে, তবুও মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে নিজের মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
কলকাতার বইমেলায় ফেরার ইচ্ছা
রাজনীতি ছাড়াও সাহিত্য নিয়েও কথা বলেছেন তসলিমা নাসরিন।
তিনি জানান, সুযোগ পেলে আবারও কলকাতা বইমেলায় অংশ নিতে চান। অতীতে পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বইমেলার সেই পরিবেশ তাঁর কাছে বিশেষ আবেগের।
পাঠকদের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপচারিতা এবং বই নিয়ে আলোচনা করার সুযোগকে তিনি এখনও সমানভাবে গুরুত্ব দেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মন্তব্য?
তসলিমা নাসরিন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সরব। ফলে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে দেশে ফিরতে না পারার অভিজ্ঞতার পরও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পক্ষে মত প্রকাশ অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
শেষ কথা
তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে তিনি নিজের নির্বাসিত জীবনের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয় নিয়ে আগামী দিনে আলোচনা আরও বাড়তে পারে। তবে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতির ওপর। বর্তমানে তসলিমা নাসরিনের মন্তব্য নতুন করে সেই বিতর্ককেই সামনে নিয়ে এসেছে।



