Sunday, September 20, 2026
Google search engine
Homeআন্তর্জাতিক৯ দিন সুড়ঙ্গে আটকে থেকেও বেঁচে ফিরলেন সঞ্জয়-কবির! নেপালে অলৌকিক উদ্ধার, এখনও...

৯ দিন সুড়ঙ্গে আটকে থেকেও বেঁচে ফিরলেন সঞ্জয়-কবির! নেপালে অলৌকিক উদ্ধার, এখনও কি ভিতরে জীবিত শ্রমিক?

কাদা, ধ্বংসস্তূপ আর অন্ধকারের মধ্যে কেটে গিয়েছে টানা ৯ দিন। বাইরে তখন উদ্ধারকারীদের মরিয়া চেষ্টা, আর ভিতরে দুই শ্রমিকের জীবন-মৃত্যুর লড়াই। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নেপালের রসুয়া জেলার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার হলেন দুই কর্মী—সঞ্জয় সাহ ও কবির মহার্জন।

২৬ আগস্ট ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর সুড়ঙ্গটি কাদা-পাথর ও ধ্বংসাবশেষে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনও নিশ্চিত খবর না পাওয়ায় ভিতরে আটকে থাকা কর্মীদের বেঁচে থাকার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছিল। কিন্তু উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে মানুষের আওয়াজ শুনতে পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় আরও তীব্র উদ্ধার অভিযান। প্রায় ১৭০ মিটার ভিতরের অংশ থেকে শেষ পর্যন্ত দু’জনকে বের করে আনতে সক্ষম হয় নেপাল সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ দল।

কীভাবে সুড়ঙ্গে আটকে পড়েছিলেন সঞ্জয়?

সঞ্জয় সাহ ছিলেন ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের মেকানিক্যাল ফোরম্যান। বন্যার সময় তিনি কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠলেও তিনি অন্য কর্মীদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিজে ভিতরে থেকে যান।

রয়টার্সকে দেওয়া তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সাধারণত কন্ট্রোল রুমে চার থেকে ছয়জন থাকেন, কিন্তু সেই দিন প্রকল্পে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। বন্যার জল ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত ঢুকে পড়তে শুরু করলে অন্যদের নিরাপদে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি নিজেই সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে পড়েন।

এই কারণেই সঞ্জয়ের বেঁচে ফেরার গল্প শুধু ভাগ্যের নয়, তাঁর সহকর্মীদের বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।

৯ দিন অন্ধকারে কীভাবে বেঁচে ছিলেন?

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সঞ্জয় জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকার সময় তিনি ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র জপ করতেন। তাঁর কথায়, এই জপ তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছিল। ঘটনাটির আরও এক আশ্চর্য দিক হল, তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর দিনেই

তবে শুধু মানসিক শক্তিই নয়, তাঁদের শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার পেছনে সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ ধসে পড়ার বদলে সুড়ঙ্গের ভিতরে এমন জায়গা তৈরি হয়েছিল যেখানে বাতাসের ফাঁকা অংশ বা air pocket থাকতে পারে। এর ফলে তাঁরা এতদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।

অবশ্য ঠিক কতটা বাতাস, জল বা অন্য কোনও সম্পদ তাঁরা পেয়েছিলেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই “নয় দিন কোনও খাবার-পানি ছাড়াই কীভাবে বেঁচে ছিলেন”—এর সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

উদ্ধারকারীরা কীভাবে তাঁদের খুঁজে পেলেন?

ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার পর সেনা, সশস্ত্র পুলিশ, নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির কর্মী এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করছিলেন।

উদ্ধারকারীরা প্রথমে বিকল্প প্রবেশপথ খুঁজে বের করেন এবং সুড়ঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে ভিতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায় এবং যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়। এরপর কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ক্রমশ ভিতরের দিকে এগিয়ে যায় উদ্ধারকারী দল।

শেষ পর্যন্ত সঞ্জয় সাহ ও কবির মহার্জনকে জীবিত অবস্থায় বাইরে আনা হয়। উদ্ধারকাজের ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, দু’জনকেই প্রচণ্ড কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা অবস্থায় বাইরে আনা হচ্ছে।

উদ্ধার হওয়ার পর তাঁদের শারীরিক অবস্থা কেমন?

দু’জনকেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সঞ্জয়ের অবস্থা স্থিতিশীল বলে রিপোর্ট করা হয়েছে।

অন্যদিকে কবির মহার্জনের শারীরিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগের ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর হাত-পায়ে আঘাত এবং শারীরিক দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। তাঁকে কাঠমান্ডুতে আরও চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ সময় অন্ধকার, কাদা, কম অক্সিজেন এবং প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে থাকার কারণে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে দু’জনকেই।

সুড়ঙ্গের ভিতরে কি এখনও কেউ বেঁচে আছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

সঞ্জয় সাহ উদ্ধারের পর জানিয়েছেন, তাঁর ধারণা অনুযায়ী সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও কয়েকজন থাকতে পারেন। কিছু স্থানীয় প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে তিন থেকে চারজন বা তারও বেশি মানুষের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট ৪২ জন কর্মী ও প্রকৌশলী আটকে পড়েছিলেন বলে অনুমান করা হচ্ছে এবং তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন এখনও জীবিত, তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।

অর্থাৎ, আরও মানুষ জীবিত থাকতে পারেন—এই আশা রয়েছে, কিন্তু তাঁদের সংখ্যা নিশ্চিত নয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল, উদ্ধারকারী দল পরে সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে একটি মৃতদেহও উদ্ধার করেছে। ফলে জীবিতদের খোঁজের পাশাপাশি হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

কেন উদ্ধারকাজ এত কঠিন ছিল?

এই উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কাদা ও ধ্বংসাবশেষে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত ভূপ্রকৃতি

২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ফলে শুধু সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ হয়নি, চারপাশের রাস্তা, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য পরিকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নদীর প্রবাহ ও জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের কারণে স্বাভাবিক পথ দিয়ে সুড়ঙ্গে পৌঁছনোও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

উদ্ধারকারী দলকে তাই বিকল্প প্রবেশপথ, ড্রিলিং, অক্সিজেন সরবরাহ এবং ধ্বংসাবশেষ সরানোর মতো একাধিক পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয়েছে।

নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের ছবিটা কতটা ভয়ংকর?

ত্রিশুলি-৩এ-এর এই উদ্ধার অভিযান গোটা বিপর্যয়ের মাত্র একটি অংশ।

২৬ আগস্টের বন্যা, হিমবাহ-সংক্রান্ত ধস ও প্রবল স্রোতে নেপালের ত্রিশুলি নদী উপত্যকা এবং বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,২৫০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। শুধু ত্রিশুলি নদী অববাহিকার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেই শত শত কর্মী নিখোঁজ বা আটকে পড়েছেন।

রয়টার্সের ৪ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, নদীর সঙ্গে যুক্ত একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় বিপুল সংখ্যক কর্মী আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সঞ্জয় ও কবিরের উদ্ধার নতুন করে আরও মানুষের বেঁচে থাকার আশা তৈরি করেছে।

৯ দিনের এই বেঁচে থাকা কি সত্যিই ‘অলৌকিক’?

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য। এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কাদা-মাটি ও ধ্বংসাবশেষে আটকে থেকেও দু’জনের জীবিত উদ্ধার গোটা নেপালে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটিকে শুধু ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে ব্যাখ্যা না করে দেখতে হবে—সুড়ঙ্গের কাঠামো কতটা অক্ষত ছিল, কোথায় বাতাসের ফাঁকা জায়গা ছিল, কীভাবে জল বা আর্দ্রতা পাওয়া গিয়েছিল এবং তাঁদের শরীর কীভাবে এত দীর্ঘ সময়ের প্রতিকূলতা সামলেছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত কারণ বোঝা সম্ভব।

আরও মানুষকে কি উদ্ধার করা সম্ভব?

আশা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

কারণ সঞ্জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ভিতরে অন্য মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেয়েছেন। তাছাড়া উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের গভীরে পৌঁছনোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নেপাল সেনা, সশস্ত্র পুলিশ এবং নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির দল এখনও অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

তবে যত সময় যাচ্ছে, ততই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে উদ্ধারকারীদের কাছে এখন প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্জয়-কবিরের উদ্ধার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই দুই শ্রমিকের জীবিত ফিরে আসা শুধু দুটি পরিবারের কাছে স্বস্তির খবর নয়। নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ে যে মানুষগুলি এখনও নিখোঁজ, তাঁদের পরিবারগুলির কাছেও এটি নতুন আশার বার্তা।

নয় দিনের অন্ধকার শেষে সঞ্জয় সাহ যখন আলোয় ফিরলেন, তখন তাঁর বেঁচে থাকার গল্পের সঙ্গে মিশে গেল হাজার হাজার মানুষের আশা। আর ভিতরে যদি সত্যিই আরও মানুষ আটকে থাকেন, তাহলে এই উদ্ধার অভিযান আরও বড় এক সাফল্যের দিকে এগোতে পারে।

একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুইজন জীবিত ফিরেছেন। এখন গোটা নেপালের অপেক্ষা—অন্ধকারের ভিতর থেকে আর কতজনের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, আর কতজনকে জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments