ভারত ছেড়ে লন্ডনে কেন সংসার পাতলেন বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা?
অঢেল অর্থ, নতুন জীবন—নাকি আসল কারণ ছিল একটু ব্যক্তিগত শান্তি?
ভারতের সবচেয়ে আলোচিত তারকা দম্পতিদের মধ্যে বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মার নাম একেবারেই প্রথম সারিতে। একজন ক্রিকেটের বিশ্বখ্যাত তারকা, অন্যজন বলিউডের পরিচিত মুখ। তাঁদের বিয়ে, সন্তান, কোথায় থাকছেন—দুই তারকার ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় প্রতিটি ঘটনাই সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
আর সেই কারণেই যখন তাঁদের লন্ডনে স্থায়ীভাবে থাকার খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—কেন ভারত ছাড়লেন তাঁরা?
এই প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে মাধুরী দীক্ষিতের স্বামী ড. শ্রীরাম নেনের একটি পুরোনো পডকাস্ট কথোপকথন সামনে আসার পর। ২০২৫ সালে রণবীর আলাহাবাদিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে তিনি অনুষ্কা শর্মার সঙ্গে তাঁদের এক আলাপের কথা স্মরণ করেছিলেন। সেখানে উঠে এসেছিল—ভারতে তাঁদের মতো উচ্চপ্রোফাইল দম্পতির পক্ষে সাধারণ জীবনযাপন কতটা কঠিন হয়ে পড়ে।
‘সাফল্য উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে’
ড. শ্রীরাম নেনে বিরাট কোহলির প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর সঙ্গে একাধিকবার দেখা হয়েছে এবং তিনি তাঁকে অত্যন্ত ভালো মানুষ হিসেবেই দেখেছেন।
এরপর অনুষ্কার সঙ্গে হওয়া একটি কথোপকথনের কথা বলতে গিয়ে নেনে জানান, তাঁদের লন্ডনে যাওয়ার ভাবনার পেছনে ছিল একটি খুব সাধারণ ইচ্ছা—সাফল্যের মাঝেও স্বাভাবিকভাবে বাঁচা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ করা।
নেনের বক্তব্যের সারমর্ম অনুযায়ী, তাঁদের জনপ্রিয়তার মাত্রা এতটাই বেশি যে তাঁরা যেখানেই যান, সেখানেই মানুষের নজর চলে আসে। বাইরে খেতে যাওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ কোনও জায়গায় সময় কাটানো—প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই সহজে ব্যক্তিগত থাকে না।
অর্থাৎ, লন্ডন বেছে নেওয়ার পেছনে যে কারণটি তিনি তুলে ধরেছেন, সেটি বিলাসিতার চেয়ে অনেক বেশি privacy বা ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে।
রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেও ‘স্বাভাবিক’ থাকা কঠিন
তারকা হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যাটিও এখানেই।
ড. নেনে ব্যাখ্যা করেন, পরিচিত মানুষদের ক্ষেত্রে জনসমক্ষে বেরোলেই বারবার সেলফি, ছবি বা কথা বলার অনুরোধ আসতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলি আনন্দের মুহূর্ত হলেও, একজন জনপ্রিয় তারকা যখন নিজের পরিবার নিয়ে একান্তে সময় কাটাতে চান, তখন একই বিষয় ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই বিরাট-অনুষ্কার সিদ্ধান্তের মূল দিকটি বোঝা যায়।
তাঁরা জনপ্রিয়তা থেকে পালাতে চাইছেন—এমন নয়। বরং জনপ্রিয়তার কারণে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন জনসমক্ষে চলে না যায়, সেটাই সম্ভবত তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সন্তানদের ‘স্বাভাবিক’ পরিবেশে বড় করতে চান
বিরাট ও অনুষ্কার দুটি সন্তান—ভামিকা এবং অকায়। ড. নেনের বক্তব্যে তাঁদের সন্তানদের বড় করে তোলার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি জানান, বিরাট ও অনুষ্কার ইচ্ছা ছিল সন্তানদের এমন পরিবেশে বড় করা, যেখানে তারা প্রতিটি মুহূর্তে ক্যামেরার সামনে থাকবে না এবং বাবা-মায়ের খ্যাতির কারণে নিজেরাও অতিরিক্ত নজরদারির মধ্যে পড়বে না।
এখান থেকেই ‘সাধারণ জীবন’-এর বিষয়টি সামনে আসে।
একজন সাধারণ শিশুর মতো স্কুলে যাওয়া, পরিবার নিয়ে বাইরে বেরোনো, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—এসব খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তার বাবা যদি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেটার হন এবং মা হন পরিচিত অভিনেত্রী, তাহলে সেই স্বাভাবিকতাই অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।
তাহলে কি ভারতে প্রাইভেসি একেবারেই সম্ভব নয়?
এখানেই শুরু হয় বিতর্ক।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—ভারতেও তো বহু তারকা পরিবার বছরের পর বছর বসবাস করছেন। শাহরুখ খান, সলমন খান, মহেন্দ্র সিং ধোনি-সহ বহু পরিচিত তারকা নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে ভারতে জীবন কাটাচ্ছেন।
তাহলে বিরাট-অনুষ্কার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটা আলাদা কেন?
এই প্রশ্নের কোনও একক উত্তর নেই। প্রত্যেক তারকার জনপ্রিয়তার ধরন, পেশা, জনসম্পর্ক, পরিবারের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং মিডিয়ার প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
বিশেষ করে বিরাট কোহলির জনপ্রিয়তা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তাঁর বিপুল পরিচিতি রয়েছে। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে জনসমক্ষে উপস্থিতির প্রভাব অন্য অনেক তারকার তুলনায় বেশি হওয়াটা অসম্ভব নয়।
তবে এটিকে ধরে নিয়ে “ভারতে থাকা অসম্ভব” এমন সিদ্ধান্তও টানা যাবে না।
বিদেশে গেলেই কি ‘সাধারণ জীবন’ পাওয়া যায়?
এই প্রশ্নটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
লন্ডনেও বিরাট ও অনুষ্কা পরিচিত মুখ। তাঁদের ছবি, অবস্থান বা প্রকাশ্য উপস্থিতি সেখানেও সংবাদমাধ্যমে আসে। তাঁদের পরিবারকে নিয়েও মানুষ আগ্রহী।
তবে বড় পার্থক্য হতে পারে জনসংখ্যার ঘনত্ব, ব্যক্তিগত পরিসরের সামাজিক সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনে তারকাদের প্রতি মানুষের আচরণে।
ড. নেনে নিজেও ভারত ও আমেরিকার জীবনযাত্রার পার্থক্য নিয়ে অন্য এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমেরিকায় তিনি বেশি ‘anonymity’ বা অপরিচিত থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ভারতে ফিরে সেই ব্যক্তিগত অজ্ঞাতপরিচয় বা anonymity-র অভাব তিনি অনুভব করেছিলেন।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই হয়তো বিরাট-অনুষ্কার পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রাসঙ্গিক।
তাহলে কি টাকার জন্য লন্ডনে গেছেন?
বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মার আর্থিক অবস্থার দিকে তাকালে এমন ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।
লন্ডনে থাকা মানেই বেশি বিলাসিতা—এমনও নয়। তাঁদের সিদ্ধান্তের যে ব্যাখ্যাটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে, সেটি হল ব্যক্তিগত জীবন এবং সন্তানদের জন্য একটি তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ তৈরি করা।
ড. নেনের বক্তব্যেও মূলত এই কারণই উঠে এসেছে। তিনি তাঁদের লন্ডনে যাওয়ার প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক কারণ, করসংক্রান্ত সুবিধা বা ভারতের প্রতি অসন্তোষকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি।
তাই “অর্থের জন্য দেশ ছেড়েছেন” বা “ভারতকে পছন্দ করেন না”—এমন দাবির পক্ষে এই পডকাস্ট কোনও প্রমাণ দেয় না।
বিরাট-অনুষ্কার লন্ডন পর্ব কবে থেকে?
দু’জনের লন্ডনে যাতায়াত নতুন নয়। তাঁদের দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং সন্তান জন্মের পরেও সেখানে তাঁদের উপস্থিতির ছবি সামনে এসেছে।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলো অবশ্য বলছে, এখন লন্ডনই তাঁদের পরিবারের প্রধান আবাসস্থল হয়ে উঠেছে। তাঁরা সন্তানদের সঙ্গে সেখানেই থাকছেন এবং জনসমক্ষে তাঁদের একাধিকবার দেখা গেছে।
অর্থাৎ, এটি এখন শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব নয়। কিন্তু কেন লন্ডন—তার সবচেয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যাটি এসেছে ড. নেনের ওই পুরোনো আলাপ থেকেই।
বিরাট কি ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন?
লন্ডনে বসবাস করা এবং ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
বিরাটের ব্যক্তিগত আবাসন কোথায়, তা তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ারের সরাসরি সমার্থক নয়। একজন ক্রীড়াবিদ এক দেশে বসবাস করেও অন্য দেশের হয়ে বা অন্যত্র গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তাই লন্ডনে থাকার সিদ্ধান্তকে বিরাটের ক্রিকেটজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কোনও কারণ নেই।
অনুষ্কা কি অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন?
অনুষ্কার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তিনি কয়েক বছর ধরে অভিনয়ে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় এবং পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে লন্ডনে থাকা মানেই তিনি স্থায়ীভাবে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো ঠিক নয়।
তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ এবং বসবাসের জায়গা দুটি আলাদা বিষয়।
শাহরুখ বা ধোনির সঙ্গে তুলনা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—“শাহরুখ, ধোনি, সলমনরা ভারতে থেকে পারলে বিরাট-অনুষ্কা পারলেন না কেন?”
আসলে তারকা জীবন কোনও নির্দিষ্ট ছকে চলে না।
কেউ নিজের জনপ্রিয়তার মধ্যেও প্রকাশ্য জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যে মেনে নেন। কেউ আবার যত বেশি জনপ্রিয় হন, তত বেশি ব্যক্তিগত পরিসরকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
একজন তারকা কীভাবে তাঁর পরিবারকে বড় করতে চান, কোন দেশে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান এবং কতটা জনসমক্ষে থাকতে চান—এসব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
তাই বিরাট-অনুষ্কার লন্ডনে থাকা মানেই ভারত তারকাদের থাকার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্ত যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনই তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে অহংকার বলে ব্যাখ্যা করাও যথাযথ নয়।
তাহলে কি ভারত ছাড়ার ‘আসল কারণ’ জানা গেল?
এক অর্থে, হ্যাঁ—একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের ইঙ্গিত মিলেছে।
ড. শ্রীরাম নেনের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বিরাট ও অনুষ্কা এমন একটি জীবন চেয়েছিলেন যেখানে তাঁদের সাফল্য থাকলেও প্রতিটি মুহূর্ত জনসমক্ষে আলোচিত হবে না। তাঁরা নিজেদের এবং সন্তানদের জন্য আরও স্বাভাবিক, অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশ চেয়েছিলেন।
কিন্তু এটিকে তাঁদের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা একমাত্র বা আনুষ্ঠানিক কারণ বলা যাবে না। কারণ বিরাট ও অনুষ্কা নিজেরা বিস্তারিতভাবে লন্ডন স্থানান্তরের সম্পূর্ণ কারণ প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি।
শেষ কথা: ‘বিলেত-প্রেম’ নয়, হয়তো ব্যক্তিগত পরিসরের খোঁজ
বিরাট কোহলি ও অনুষ্কার লন্ডন জীবন নিয়ে আলোচনা চলবেই। কেউ বলবেন, এত জনপ্রিয়তার পরও নিজের দেশে থাকার পথ খোঁজা উচিত ছিল। আবার কেউ বলবেন, প্রত্যেক পরিবারের নিজের মতো করে শান্তিতে বাঁচার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু ড. শ্রীরাম নেনের কথাগুলি অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করে—লন্ডনে যাওয়ার আলোচনায় ‘অহংকার’ বা ‘ভারতকে অপছন্দ’ করার কোনও প্রমাণ নেই। যে কারণটি তিনি শুনেছিলেন, সেটি ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত—অতিরিক্ত নজরদারি থেকে দূরে গিয়ে নিজেদের সাফল্য উপভোগ করা এবং সন্তানদের তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশে বড় করে তোলা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা হয়তো “ভারত না লন্ডন”—এমন নয়।
প্রশ্নটা হল—বিশ্বের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে একজন মানুষ তার নিজের জন্য কতটুকু ব্যক্তিগত জীবন বেছে নিতে পারবেন?
সেই উত্তরটাই হয়তো বিরাট-অনুষ্কার লন্ডন অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় গল্প।



